
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ৫৬ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি বেলিন প্রজাতির মৃত তিমি ভেসে এসেছে। খবর পেয়ে আজ সোমবার দুপুর ১২টার সময় কুয়াকাটা সৈকতের কাউয়ার চর এলাকায় ছুটে যান উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সদস্যরা। এ সময় তিমিটিকে একনজর দেখতে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা ভিড় করেন।
এর আগে ৩ জুন কুয়াকাটা সৈকতের ঝাউবাগানসংলগ্ন পূর্ব পাশে ৫৮ ফুট দৈর্ঘ্যের এবং ২০ ফুট প্রস্থের বেলিন প্রজাতির আরও একটি মৃত তিমি ভেসে এসেছিল।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক কে এম বাচ্চু বলেন, ‘সকালে তরিকুল ইসলাম নামের স্থানীয় ট্যুর গাইড মৃত তিমিটি দেখে আমাদের খবর দেন। পরে আমরা বন বিভাগকে অবহিত করি। মৃত তিমিটির দৈর্ঘ্য ৫৬ ফুট এবং প্রস্থ ১৬ ফুট। ধারণা করা হচ্ছে, এক সপ্তাহ আগে এটির মৃত্যু হয়েছে।’
বেলিন তিমি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী, যাদের দাঁতের পরিবর্তে মুখে ‘বেলিন’ নামের ঝালরের মতো প্লেট থাকে। এরা এই বেলিনের সাহায্যে সমুদ্রের পানি ছেঁকে অতি ক্ষুদ্র ক্রিল ও প্ল্যাঙ্কটন খেয়ে বেঁচে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমি এই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। এরা আকারে বিশাল হয়। দৈর্ঘ্য ২০ ফুট থেকে শুরু করে ১০০ ফুট (নীল তিমি) পর্যন্ত হতে পারে। এরা মুখে থাকা কেরাটিন নির্মিত শক্ত, কিন্তু নমনীয় বেলিন প্লেট দিয়ে পানি ছেঁকে খাবার খায়। এদের মাথার ওপর দুটি শ্বাসছিদ্র বা ব্লোহোল থাকে।
পৃথিবীর প্রায় সব মহাসাগরেই তিমি পাওয়া যায়। তবে প্রচুর খাদ্যের (ক্রিল) খোঁজে গ্রীষ্মকালে এরা মেরু অঞ্চলের আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিক মহাসাগরে এবং শীতকালে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে পরিভ্রমণ করে থাকে।
উপকূল ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ (তুষার) বলেন, তিমিটির নমুনা সংগ্রহ ও প্রজাতি শনাক্তকরণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মৃত তিমিটির যথাযথ সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য কঙ্কাল সংরক্ষণ করাও যেতে পারে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী জানান, কুয়াকাটা উপকূলে তিমি ভেসে আসার ঘটনা সামুদ্রিক প্রতিবেশের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বা নেক্রোপসি অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত জালে আটকে যাওয়া, জাহাজের আঘাত, অসুস্থতা, প্লাস্টিক দূষণ, খাদ্যসংকট কিংবা সমুদ্রের স্রোতের কারণে মৃত বা দুর্বল তিমি তীরে ভেসে আসতে পারে।
মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও তিমির পেটে কী ছিল, শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে কি না, কিংবা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয়ে আমরা স্পষ্ট তথ্য পাচ্ছি না। যাঁরা তিমির দেহ সরানোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁদের মাধ্যমেও নমুনা সংগ্রহ ও কারণ অনুসন্ধানের ব্যবস্থা করা দরকার।’
কলাপাড়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসীন সাদেক বলেন, উপজেলা প্রশাসন সব সময়ই উপকূলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করে। তিমিটি পচাগলা অবস্থায় থাকার কারণে বন বিভাগ এবং পৌরসভার সহযোগিতায় মাটিচাপা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটক এবং বাসিন্দাদের ভোগান্তি পোহাতে না হয়।