
হাওরপারে তখন বিকেল নেমে এসেছে। মানুষের মধ্যে তখন সব গুছিয়ে ঘরে ফেরার তাড়া। কেউ সড়কের ওপর মেলে দেওয়া ধানের খড় জড়ো করছেন, কেউ খড়ের গাদা সাজিয়ে তুলছেন। কেউ খলায় মেলে রাখা ধান টেনে এক জায়গায় স্তূপ করছেন, কেউ টুকরি মাথায় করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। যাঁরা এতক্ষণ হাওরে ধান কাটায় ব্যস্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকে সন্ধ্যার আগেই বাড়ির পথে ফিরছেন।
হাওরে ধান কাটার মৌসুমে হাওরপারের মানুষের এমন তৎপরতা স্বাভাবিক। এ সময় ঘরে ওঠে সাধের বোরো ফসল। যুগ যুগ ধরে বৈশাখে এমনটাই হয়ে আসছে। সারা বছরের খোরাকি, সংসারের খরচ সব এই ধান বিক্রি করেই হয়। বেশির ভাগ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস এই ধান।
কিন্তু ফসল তোলার এই সময়টাও মাঝেমধ্যে হয়ে ওঠে কঠিন। অসময়ের অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি কিংবা হাওরে ঢলে কৃষকের সাজানো সব আয়োজন তছনছ হয়ে যায়। অবেলার পানিতে ভেসে যায় স্বপ্ন। গত শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে গেলে মানুষ সবার আগে সেই ভেসে যাওয়ার কথাই বলেছেন। কারও ২০-৩০ কিয়ার (১ কিয়ার = ৩০ শতক), কারও ৫০-১০০ কিয়ার জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। দুই-তিন কিয়ার জমির ধান হারিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও অগণিত।
ফতেহপুর ইউনিয়নের কাশিমপুরের ইয়াওর মিয়া (৭৫) বলেন, ‘আমরার অউ (এই) এক খেতউ (জমি), খালি বোরো খেত। আগন মাইয়া (অগ্রহায়ণ মাসের আমন) খেত নাই। ঋণবিন করি খেত করলাম। সব পানির তলে। অখন খাইতাম না ঋণ দিতাম।’
ইয়াওর মিয়া জানান, নিজের ও অন্যের মিলিয়ে কাউয়াদীঘি হাওরের নিয়ামত বিল ও আওয়া বিল এলাকায় ৯ কিয়ার জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র দুই কিয়ার জমির ধান কেটে তুলতে পেরেছেন। বাকি সাত কিয়ার জমির ধান এখনো পানির নিচে।
ইয়াওর মিয়া বলেন, ‘আমার বোঝ অইছে থাকি খেত করি। লেখাপড়া করছি না। খেত করি খাই। আমি বুড়া মানুষ। কামকাজ করতাম পারি না। আল বাওয়ানি (হাল চাষ), ধান রওয়ানি (রোপণ) মাইনসরেদি করাইছি। এতে ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ অইছে। ঋণ আছে ৩৫ হাজার টাকা। ঋণর লাগি মাইনসে চাপ দের। যেগুন পাইছি, ভাবছি অগুইন দিলাইমু। কিন্তু যেগুইন পাইছি, এগুইনতো পচিয়া যারগি।’
পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়েসহ চারজন সদস্যের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। অন্য মেয়েরা ও তাঁদের সন্তানরাও মাঝেমধ্যে আসেন। মাসে অন্তত ৫০ কেজি চালের প্রয়োজন পড়ে। ইয়াওর মিয়া বলেন, ‘অখন কেমনে চলমু আল্লায় জানইন। আত্মীয়স্বজন কিছু সাহায্য করইন, তারা যদি দেইন, এটাই অখন ভরসা। বহুদিন এমলান পানিয়ে ধান নিচে না। এবার হাওরর জমি এক রাইতে তল করি লাইছে ।’
ফসল তলিয়ে যাওয়ার এই শূন্যতা শুধু ইয়াওর মিয়ার নয়। হাওরপারের গ্রামে গ্রামে এখন নীরব কান্নার মতো মানুষের হাহাকার। মাঝেমধ্যেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তাঁরা। যে সময়টা উৎসবের হওয়ার কথা, সেটাই এখন হয়ে উঠেছে টিকে থাকার নিঃশব্দ লড়াই।
এই লড়াই এখন কাশিমপুরেও চলছে। তবে কেউ হাত গুটিয়ে বসে নেই। পরিবারের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর—সবাই মিলে শামিল হয়েছেন সংগ্রামে। কেউ পানির নিচ থেকে ডুবে থাকা ধান তুলছেন। কেটে আনা ধান পচে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে, রোদ পেয়ে সেই ধান শুকানোর চেষ্টা চলছে। পচে যাওয়া ধান বাঁচাতে রোদ কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।