ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মুন্সিগঞ্জের তিনটি আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখনো মেটেনি। জেলার তিনটি আসনের মধ্যে দুটিতে দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়া তিন নেতা। এতে দলটির ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী জেলার তিনটি আসনের মধ্যে দুটিই ১০–দলীয় জোটের শরিক দুই দলকে ছাড় দিচ্ছে। এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নুর হোসাইন নুরানীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কারণ, আসনটিতে জামায়াতের কেউ প্রার্থী হননি। প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেন নুর হোসাইন। সর্বশেষ গতকাল শনিবার নির্বাচন কমিশনে শুনানি শেষে আপিল মঞ্জুর হয়েছে বলে বলে দাবি করেছেন নুর হোসাইন নুরানী। জেলার তিনটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
নির্বাচনে প্রার্থী হতে মুন্সিগঞ্জ-১ ও মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে ৭ জন করে এবং মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে ৯ জনসহ মোট ২৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাইয়ে মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে তিনজন ও মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে তিনজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। এর মধ্যে পাঁচজনই আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত জোট–সমর্থিত প্রার্থী নুর হোসেন নুরানী আপিল শুনানি শেষে গতকাল তাঁর প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মো. আবদুল্লাহকে আসনটিতে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে। তবে মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই কেন্দ্রীয় বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী (সপু) ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মমিন আলীর অনুসারী নেতা-কর্মীরা সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন এই দুই নেতা।
মোহাম্মদ মমিন আলী বলেন, ‘শ্রীনগর-সিরাজদিখানের মানুষ আমাকে চান। তাঁদের চাওয়ার কারণে ভোটের মাঠে আসতে বাধ্য হয়েছি। জনগণ আমার সঙ্গে আছেন। শেষ পর্যন্ত জনগণ আমার সঙ্গে থাকবেন। তাঁদের ভোটে আমি জয়ী হব।’
এদিকে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি মীর সরফত আলী।
সবার চাওয়ার জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। যদি দল থেকে মনোনয়ন না হয়, সে ক্ষেত্রে জনগণ ও আমার আসনের নেতা-কর্মীরা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, আমি সেটাই মেনে নেব।মো. মহিউদ্দিন, মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব
অবশ্য বিএনপির প্রার্থী শেখ মো. আবদুল্লাহ বলেন, দেশের মানুষ হিসেবে সবার নির্বাচন করার অধিকার আছে। সে ক্ষেত্রে ভোটের মাঠে দু-চারজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকতেই পারেন। জনগণ জানেন কাকে ভোট দিলে তাঁদের জন্য ভালো হবে। তিনি আশাবাদী, জনগণ তাঁকেই বেছে নেবেন।
বিএনপির ত্রিমুখী কোন্দলের সুযোগে আসনটিতে চমক দেখাতে চায় জামায়াতে ইসলামী। আসনটিতে জামায়াত প্রার্থী করেছে দলের জেলা সেক্রেটারি এ কে এম ফখরুদ্দিন রাজীকে। তিনি বলেন, ‘এ আসনের মানুষ জামায়াতকে ভোট দিতে চায়। তারা আমাকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাতে চায়। আমি আশা করছি বড় ভোটের ব্যবধানে এ আসনে জয়লাভ করব।’
আসনটিতে আরও প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আবদুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আতিকুর রহমান খাঁন ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের রোকেয়া আক্তার।
প্রথম দফায় মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও এক্মি গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সিনহা। তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। এতে ক্ষোভ দেখা দেয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আবদুস সালাম ও ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামানের অনুসারীদের মধ্যে। তাঁরা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। এর মধ্যে মিজানুর রহমান সিনহা অসুস্থ হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যান। এরপর চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় আবদুস সালামকে। জেলার কেবল এই আসনে বিএনপির কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হননি।
বিএনপির প্রার্থী আবদুস সালাম বলেন, ‘যেখানে যাচ্ছি মানুষের দোয়া, ভালোবাসা পাচ্ছি। আমি আশা করছি, জনগণ আমাকে বড় ব্যবধানে জয়ী করবেন।’
আসনটিতে আরও প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের এ বি এম ফজলুর করীম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কে এম বিল্লাল, এনসিপির মাজেদুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. আমিনুল ইসলাম, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের আশিক মাহমুদ ও জাতীয় পার্টির (জাপা) মো. নোমান মিয়া।
১০–দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসনটি এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির আজম রুহুল কুদ্দুস। এ ছাড়া মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এনসিপির প্রার্থী দলের মুন্সিগঞ্জ জেলা সমন্বয়ক মাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘জোট থেকে এ আসনে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমাদের দলের নেতা-কর্মীসহ ইসলামি দলগুলো আমার সঙ্গে রয়েছে। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে দেখেছে, বিএনপিকেও দেখেছে। এখন তৃতীয় কাউকে দেখতে চায়।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশের শুরা সদস্য এ বি এম ফজলুল করিম মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের
প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। জামায়াত তাদের জোট শরিক হিসেবে আসনটি এনসিপির জন্য ছাড় দিয়েছে। তবে প্রার্থী হিসবে রয়ে গেছেন এ বি এম ফজলুল করিম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের জোট থেকে একটি
দল বেরিয়ে গেছে। এ জন্য আমাদের অনেক আসন ফাঁকা রয়েছে। যেকোনো সমস্যার কারণে আমাদের কোনো আসন যাতে ফাঁকা না থাকে, সে জন্য ছাড় দেওয়ার পরও প্রার্থী হিসেবে কাগজে–কলমে রয়েছি। তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করব।’
জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন বিবেচনা করা হয় মুন্সিগঞ্জ-৩-কে। গত ৪ ডিসেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক মো. কামরুজ্জামানকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এখানে দলের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব মো. মহিউদ্দিন। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে পরিবর্তনের দাবি তুলে শহরের প্রধান সড়ক, সেতুতে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন মো. মহিউদ্দিনের সমর্থকেরা। এ ছাড়া লাগাতার মশালমিছিল, বিক্ষোভ, সভা-সমাবেশ করেন। আসনটির দুটি উপজেলা বিএনপির ৩৫টি ইউনিটের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নিয়ে প্রার্থীর পরিবর্তন ও মহিউদ্দিনকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এমন অবস্থায় দলীয় প্রার্থী পরিবর্তনের খবরও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কামরুজ্জামান দলীয় প্রার্থী এবং মো. মহিউদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেন।
বিএনপির নেতা-কর্মীরা বলছেন, মহিউদ্দিন নির্বাচনের মাঠে থেকে গেলে কামরুজ্জামানের সঙ্গে তাঁর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘এ আসনের জনগণ আমাকে চান, নেতা-কর্মীরাও আমাকে চান। সবার চাওয়ার জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘যদি দল থেকে মনোনয়ন না হয়, সে ক্ষেত্রে জনগণ ও আমার আসনের নেতা-কর্মীরা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, আমি সেটাই মেনে নেব।’
বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটের জন্য যেখানেই যাচ্ছি মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। জনগণ ধানের শীষে ভোট দিতে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। দলের বাইরে গিয়ে যিনি মনোনয়নপত্র তুলেছেন, আশা করছি তিনি সময়মতো দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন।’
১০–দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নুর হোসাইন নুরানীর সমর্থনে আসনটিতে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। তবে যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করলে গতকাল তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান।
নুর হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ আসনে বিএনপির একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে। সে ভোট দুই ভাগে ভাগ হবে। এর বাইরে যত ভোট আছে, সব আমাদের পক্ষে যাবে। এতে এবার এ আসনে আমাদের দল বড় জয় পাবে।’
আসনটিতে আরও প্রার্থী হিসেবে আছেন ইসলামী আন্দোলনের সুমন দেওয়ান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) শেখ মো. কামাল হোসেন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ মো. শিমুল, জাতীয় পার্টির মো. আরিফুজ্জামান (দিদার), খেলাফত মজলিসের হাজি আব্বাস কাজী ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির আনিছ মোল্লা।