বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীদের লিফলেট দেখছেন এক শিক্ষার্থী। গত রোববার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে
বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীদের লিফলেট দেখছেন এক শিক্ষার্থী। গত রোববার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে

জাকসুর প্যানেল পর্যালোচনা-০৪

জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা সামনে এনে ভোট টানার চেষ্টা ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’। প্যানেলটিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ও গুরুতর আহত শিক্ষার্থী যেমন আছেন, তেমনি বিভিন্নভাবে ক্যাম্পাসে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাও আছেন। এ কারণে নির্বাচনে প্যানেলটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

তবে প্যানেলের শীর্ষ প্রার্থীসহ বেশ কয়েকজন প্রার্থী অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁদের এই রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ক্যাম্পাসে ভোটারদের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। জাকসুর ২৫টি পদের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন থেকে ১৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আন্দোলন থেকে পরিচিত মুখ

স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলে সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আবদুর রশিদ (জিতু)। গণ-অভ্যুত্থানের আগে তিনি নিষিদ্ধঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। জুলাই আন্দোলনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে একযোগে ১৮ জন সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়ক পদত্যাগ করেন। ওই সময় আবদুর রশিদের নেতৃত্বে পদত্যাগকারী কয়েকজন মিলে ‘গণ-অভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। ওই সংগঠনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, পোষ্য কোটা বাতিলসহ বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন আবদুর রশিদসহ অন্যরা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নেতিবাচক ভূমিকায় দেখা গেলেও ক্যাম্পাসে আবদুর রশিদ ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রেখেছিলেন। ক্যাম্পাসে এক হাজারের বেশি সাবেক ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রয়েছে। পূর্বে ছাত্রলীগের রাজনীতি করায় ছাত্রলীগের ভোটগুলো তিনি পেতে পারেন বলে ধারণা করছেন অনেকে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের একটি পক্ষও তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে আলোচনা রয়েছে।

এই প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন ইতিহাস বিভাগের ছাত্র সংসদের ভিপি শাকিল আলী। জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। ওই সময় পুলিশের গুলিতে তাঁর আহত হওয়ার ছবি ক্যাম্পাসে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ ছাড়া তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংগঠন তরী স্কুলের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। শাকিল আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ নম্বর আবাসিক হলে থাকেন। হলটিতে প্রায় এক হাজার ভোটার রয়েছেন। হলের ভোটগুলোও শাকিল ও তাঁর প্যানেলকে এগিয়ে রাখবে বলে ধারণা করছেন অনেকে।

এই প্যানেল থেকে সহসাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে নির্বাচন করছেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী নিবিড় ভূঁইয়া। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া তিনি ফেসবুকে ভ্লগ ভিডিও তৈরি করার কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ পরিচিত তিনি।

ছাত্রলীগ–সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সংশয়

প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য প্যানেলের প্রার্থীরা বলছেন, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেল থেকে পাঁচজন প্রার্থী নির্বাচন করছেন, যাঁরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে গেস্টরুম কালচার, নির্যাতন, টেন্ডারবাজিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে ছাত্রলীগ সম্পর্কে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কারণে ভোটের মাঠে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।

এ বিষয়ে আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সুসময়ে আমি বিদ্রোহ করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে রাজপথে স্লোগান দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা সব সময় আমাকে ইতিবাচক হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।’

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, ভিপি প্রার্থী আবদুর রশিদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের থেকে পদত্যাগ করেন। পরে জাকসু নির্বাচনের আগে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ প্যানেল থেকে ভিপি পদে নির্বাচনের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়।

স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলে আবদুর রশিদসহ অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতি করা একাধিক প্রার্থী থাকায় নির্বাচনে তাঁরা জয় পেলে ক্যাম্পাসে আবার ছাত্রলীগ সক্রিয় হতে পারে এমন প্রচরণা চালাচ্ছে ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা।

অবশ্য স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলের প্রার্থীরা প্রচারণায় জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, আন্দোলনের মুখ্য নেতৃত্ব, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালনসহ বিভিন্ন বিষয়কে ভোটারদের সামনে তুলে ধরেছেন। প্যানেলে থাকা ‘পরিচিত মুখের’ প্রার্থীদের মাধ্যমেও ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন তাঁরা।