বরিশালে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সড়ক অবরোধ, মিছিল ও ককটেল–পেট্রলবোমা নিক্ষেপের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২৪৮ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে মামলার আসামির তালিকায় মারা যাওয়া চার নেতার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় অভিযোগের সত্যতা ও মামলার তথ্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মারজুক আবদুল্লাহ নামের এক যুবকের দায়ের করা নালিশি মামলায় অভিযোগ করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গত ১০ জুন, ১৬ জুন ও ২২ জুন সড়ক অবরোধ, মিছিল ও বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করেছেন। বিচারক এস এম শরীয়ত উল্লাহ অভিযোগ আমলে নিয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার বাদী মারজুক আবদুল্লাহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল জেলার সাবেক সমন্বয়ক। তিনি বরিশাল নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ক্লাব রোড এলাকার বাসিন্দা।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার জানান, মামলায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ, বরিশাল জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর, সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান, বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র জিয়াউর রহমান ও রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া আসামির তালিকায় রয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি খন্দকার রেজাউর রহমান, ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবুল ফারুক হুমায়ুন, ২২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এইচ এম হাফিজুর রশিদ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী হাওলাদার।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর রহমান ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি মারা যান। কিন্তু মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি ১০ জুন নগরীর গড়িয়ারপাড় এলাকায় আওয়ামী লীগের ব্যানারে মিছিলে অংশ নিয়ে সড়কে হাতবোমা নিক্ষেপ করেন। একইভাবে ১৯৮ নম্বর আসামি আবুল ফারুক হুমায়ুন ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ মারা গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে ১০ জুনের মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২২৫ নম্বর আসামি এইচ এম হাফিজুর রশিদ ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর ও ১৯৫ নম্বর আসামি মোহাম্মদ আলী হাওলাদার একই বছরের ২৬ জুলাই মারা যান। অথচ তাঁদের বিরুদ্ধেও ওই মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রাজীব হোসেন খান বলেন, ‘মারজুক নামের যে ব্যক্তি মামলাটি করেছেন, তাঁকে বরিশালের সবাই মামলা ব্যবসায়ী হিসেবে চেনেন। আগেও তিনি একটি মামলা করেছিলেন। এই মামলা যে ভিত্তিহীন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ চারজন মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের জানাজায় আমি উপস্থিত ছিলাম।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, এই চারজন অনেক আগেই মারা গেছেন। এ ছাড়া মামলার বাদী আসামি করার ভয় দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে চাঁদা তুলেছেন।
এ বিষয়ে জানতে মামলার বাদী মারজুক আবদুল্লাহর সঙ্গে ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
২০২৫ সালের ১৪ মে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমুসহ ২৪৭ জনের নামে জুলাইয়ের মামলা করেছিলেন মারজুক। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে আসামি তালিকায় নাম রাখা ও বাদ দেওয়া নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাই সংবাদ সম্মেলন করে তখন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা–বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর পদ স্থগিত করেছিল সংগঠনটির জেলা কমিটি।