নির্মাণাধীন ভবনের ভিডিও ধারণ করতে করতে এক ব্যক্তি বলছেন—‘অনেক ভবন এখানে। ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা খাওয়া যাবে। গুলি করতে হবে, যারা গাদ্দারি করে।’ চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার এক ব্যক্তির মুঠোফোনে পাওয়া যায় এই ভিডিও।
গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তির নাম সাইদুল ইসলাম। ১৫ মার্চ নগরের বায়েজিদ বোস্তামির নয়াহাট এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের কাছে পাঠাতে ভিডিওটি ধারণ করেছেন সাইদুল ইসলাম। নির্মাণাধীন ভবন থেকে চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যেই ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে।
ভিডিওটি ধারণ করা হয় নয়াহাট এলাকাতেই। সাইদুল ইসলাম ওই এলাকার বাসিন্দা। ভিডিওতে নির্মাণাধীন কয়েকটি ভবন দেখিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সাইদুলকে বলতে শোনা যায়, ‘এখানে পাইলিং চলছে। ওদিকে দূরে আরেকটিতেও পাইলিংয়ের কাজ চলছে। অনেক কাজ চলছে। এখানে আরও কয়েকটির পাইলিং হবে।’
পুলিশ জানায়, গত বছরের নভেম্বরে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে (৪৩) গুলি করে হত্যার মামলায় সাইদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর সহযোগী। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে নির্মাণাধীন ভবনের ভিডিও ধারণ করে সাজ্জাদের কাছে পাঠানোই তাঁর কাজ। এর বিনিময়ে তিনি প্রতি সপ্তাহে পাঁচ হাজার টাকা করে পান। সাইদুলের মতো আরও অর্ধ শতাধিক সোর্স সাজ্জাদের রয়েছে। তাঁরা নগরের বায়েজিদ বোস্তামি, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, হাটহাজারী, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের বিষয়ে সাজ্জাদকে তথ্য দেন।
সাইদুলের মতো আরও অন্তত অর্ধ শতাধিক সোর্স সাজ্জাদের রয়েছে। তাঁরা নগরের বায়েজিদ বোস্তামি, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, হাটহাজারী, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের বিষয়ে সাজ্জাদকে তথ্য দেন।
বায়েজিদ বোস্তামি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার সাইদুল ইসলামের মুঠোফোনে নির্মাণাধীন ভবনের একাধিক ভিডিও পাওয়া গেছে। তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সন্ত্রাসী সাজ্জাদের জন্য ভিডিও ধারণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। নির্মাণাধীন ভবনের ভিডিও ধারণের পাশাপাশি কোন ভবন থেকে কত টাকা চাঁদা আদায় করা যাবে, মালিকের পরিচয়, চাঁদা না দিলে কী করণীয়, সে বিষয়ে ধারণা দিতেন সাইদুল।
ওসি জাহেদুল কবির আরও বলেন, ‘গ্রেপ্তার সাইদুলকে রিমান্ডে এনে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকি ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
সন্ত্রাসী সাজ্জাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরজুড়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে। ওই সময় বাসাটিতে পুলিশের পাঁচ সদস্য পাহারায় ছিলেন। গুলিতে বাসার জানালার কাচ ভেঙে যায়। এর আগে ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল। কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে জানায় পুলিশ।
ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন সন্ত্রাসী দুই হাতে দুটি পিস্তল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছেন। এ ছাড়া একজন সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং আরেকজন শটগান থেকেও গুলি ছোড়েন।
কে এই সাজ্জাদ
নগরের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান মূলত অপরাধজগতে পরিচিত হন ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের পর। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় সাজ্জাদ খালাস হলেও নগরের অপরাধজগতে তাঁকে নিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।
২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে বার্স্ট ফায়ারে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার দাবি ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাজ্জাদ। একই বছরের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন সাজ্জাদ। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে তিনি দেশ ছাড়েন। এর পর থেকেই বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে তাঁর বাহিনী। অবশ্য ‘এইট মার্ডার’ মামলা থেকেও খালাস পেয়েছেন সাজ্জাদ।
শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়ে ওঠে এই বাহিনী। ম্যাক্সন ভারতে মারা যান, সরোয়ার দল ছাড়েন। গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থীর নির্বাচনী জনসংযোগে সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে বড় সাজ্জাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নিয়ন্ত্রণ করছেন নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। সাজ্জাদ ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায় আছেন। তালিকা অনুসারে তাঁর নাম সাজ্জাদ খান।
পুলিশ জানায়, চাঁদা না পেলেই গুলি করেন সাজ্জাদের অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামি ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত জেলায় জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তারা কখনো আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের প্রতিপক্ষকে খুন করছেন, আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছেন। ২০১৫ সাল থেকে দেশে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
পুলিশ বলছে, গত বছর বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের সমালোচনা করায় এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় বায়েজিদের আরেক সন্ত্রাসী আকবর হোসেন ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সক্রিয় রয়েছেন অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী। ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর দলের নেতৃত্ব আসে ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে। এই দলে আরও রয়েছেন খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ—যাঁদের অধিকাংশই অস্ত্র চালনায় বিশেষ দক্ষ। দলটিকে বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠান বড় সাজ্জাদ।
জানতে চাইলে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, খুনের মামলার বেশির ভাগ আসামিকে পুলিশ ধরেছে। বড় সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে চেষ্টা চলছে।