‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করে আলোচনায় আসা শাহেদ শরীফ আহমেদ। রোববার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসায়
‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করে আলোচনায় আসা শাহেদ শরীফ আহমেদ। রোববার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসায়

মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা পেতে ঘুষ দাবি, ক্ষোভে কিশোর শাহেদের ‘ঘুষ.সাইট’

মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে বারবার ঘুষের দাবির মুখে পড়তে হয়েছিল পরিবারের সদস্যদের। নিজের পাসপোর্ট করতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা হয় ১৭ বছরের শাহেদ শরীফ আহমেদের। প্রশাসনের পদে পদে ঘুষের এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে অভিনব এক উদ্যোগ নেয় সে। খুলে বসে একটি ওয়েবসাইট, যাতে ঘুষ দাবির অভিযোগ জানাতে শুরু করেন ভুক্তভোগীরা।

‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের ওয়েবসাইটটি চালুর মাত্র ৯ দিনে (রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত) ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা।

শাহেদ শরীফ আহমেদ ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে। সে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছে। তার বাবা শরীফুল ইসলাম (শামীম) আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। শাহেদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান।

পরিবারটি জানায়, চাকরির ১৩ বছরের মাথায় আমিনা খাতুনের মৃত্যুর পর তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডের (ভবিষ্য তহবিল) প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকাসহ মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য ৮ লাখ টাকার জন্য শিক্ষা কার্যালয়–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দুই ঘণ্টায় ওয়েবসাইটের কাঠামো তৈরি

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও যন্ত্রণার কারণেই ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানায় শাহেদ শরীফ। সে বলে, ‘আম্মুর পেনশনের টাকার ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গেলে ফাইল আটকে রেখে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যে কাজ করে দেওয়া হয়। এই ক্ষোভ থেকেই ওয়েবসাইটটি বানাই।’

শাহেদ জানায়, ভারতে প্রচলিত একটি ওয়েবসাইট দেখে সে এ উদ্যোগের অনুপ্রেরণা পায়। মাত্র দুই ঘণ্টায় কোডিং করে ওয়েবসাইটটির কাঠামো তৈরি করে সে। পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের কাজ শিখেছে শাহেদ। পরে তার বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহায়তায় ডোমেইন কেনা হয় এবং ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালুর পর তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠাতা দুজন—শাহেদ শরীফ আহমেদ ও সাইফ কবির। শাহেদ কোডিং ও কারিগরি দিক সামলাচ্ছে। আর সাইফ বিপণন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি দেখছে। অভিযোগ যাচাই ও স্ক্রিনিংয়ের জন্য তাদের চার সদস্যের একটি মডারেশন টিম রয়েছে বলে জানায় শাহেদ।

পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের কাজ শিখেছিল শাহেদ শরীফ। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি করেন ‘ঘুষ.সাইট’। রোববার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসায়

‘এতটা ভাইরাল হবে, তা ভাবিনি’

সাইটটি তৈরির পর কোনো হুমকি পাচ্ছে কি না বা নিরাপত্তার আশঙ্কা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শাহেদ বলে, ‘এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ, কোনো হুমকি বা নেতিবাচক ফোন পাইনি। শুরুতে এতটা ভাইরাল হবে, তা ভাবিনি। ভেবেছিলাম, সিভিতে যুক্ত করব। তবে ভবিষ্যতে কোনো আশঙ্কা তৈরি হতেও পারে।’

বর্তমানে আইনি ঝুঁকি এড়াতে ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় বা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য সাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আইনি (লিগ্যাল) টিম গঠন বা সরকারি সমর্থন পেলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ড্যাশবোর্ডে যুক্ত করার ইচ্ছা রয়েছে বলে জানায় শাহেদ।

শাহেদ শরীফ আহমেদ বলে, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারের টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা সবাইকে জানানো। সরকারি অফিসে ঘুষ নেওয়া অত্যন্ত অন্যায় ও গর্হিত কাজ। আমরা বিষয়গুলো সবার সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে চাই, যেন মানুষ জানতে পারে বাংলাদেশে কীভাবে এসব অনিয়ম ঘটছে।’

সরকারি সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার স্বপ্ন দেখে শাহেদ শরীফ। সে আরও বলে, ‘সরকার যদি এই তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তা শুধু আমাদের উদ্যোগের সফলতা নয়, দেশের জন্যও বড় সুফল বয়ে আনবে। আমার মূল লক্ষ্য কোনো নীতিগত শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আমি সোজা কথায় ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনতে চাই। যেন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে কারও ঘুষ নেওয়ার সুযোগ না থাকে এবং সাধারণ মানুষ কোনো অন্যায় বাধা ছাড়াই তাঁদের প্রাপ্য সেবা পেতে পারেন।’

তরুণদের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য এলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।

সচেতন নাগরিক কমিটি ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান বলেন, দেশের দুর্নীতির মূল উৎস হলো ঘুষ। ঘুষ দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং মানুষের মৌলিক অধিকার থেকে অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের পদে পদে ছড়িয়ে পড়া ঘুষের চিত্র এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সরকার যদি নিজে থেকেই এ ধরনের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতার উদ্যোগ নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ চরমভাবে উপকৃত হবে।

স্কুলশিক্ষক স্ত্রীর মৃত্যুর পর ঘুষ না দেওয়ায়, টাকা না পাওয়ায় বিভিন্ন কাগজপত্র দেখান শরীফুল ইসলাম। রোববার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসায়

১০ লাখ পেতে ‘১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি’

শাহেদ শরীফের বাবা শরীফুল ইসলাম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি টাকা তুলতে গিয়ে তাঁকে ঘুষের মুখে পড়তে হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই ঘুষ দিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলেছেন। বাকি ১০ লাখ টাকা পেতে ১ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। কম করে হলেও ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হবে বলে তাঁকে জানানো হয়েছে।

শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘কাগজপত্র নিয়ে শিক্ষা অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কাজ হচ্ছে না। উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস মিলে ১ লাখ টাকা না হলে কাজ হবে না। আমি জেদ ধরেছি, ঘুষ না দিয়ে পাওনা টাকা তুলব। দেশের স্বার্থে ছেলে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’

শিক্ষক আমিনা খাতুনের পেনশনের টাকা পাওয়া গেলেও কল্যাণ তহবিল ও চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য মোট ১০ লাখ টাকা কেন পাওয়া যাচ্ছে না, তা জানতে রোববার বিকেলে সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যাওয়া হয়। তবে শিক্ষকের ফাইল খুঁজে পাননি সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।

কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবুর রহমান ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘কেউ আমার কাছে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি। আমার কাছে কাগজ নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে দিয়ে দিই।’

এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন প্রথম আলোকে বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে কিছু জানাননি। এখানে যদি কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে অবশ্যই তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। মৃত শিক্ষকের সব বকেয়া দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন তিনি।