সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকা দান করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে বলছেন, মাজার দানের টাকায় নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। মূলত আলোচনার জন্ম দিতেই সদ্যবিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলম এমন ‘স্ট্যান্টবাজি’ করেছেন।
এ বিষয়ে সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সদ্য বিদায়ী ডিসি মাজারবিরোধী কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়ে বদলি হন। যেখানে মাজারের দানের টাকা গুনে গুনে ডিসি দেখালেন প্রচুর টাকা আসে, সেখানে যাওয়ার আগে মাজার তহবিলে ৫ লাখ টাকা দিয়ে রীতিমতো পলিটিক্যাল স্ট্যান্টবাজিই করলেন।’
১২ জুন হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান সাবেক ডিসি সারওয়ার আলম। এ সময় তিনি মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের অর্থ রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেক ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়।
এ ঘটনার পর জেলা প্রশাসকের পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। কেউ জেলা প্রশাসকের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেন। আবার প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপনের বিষয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ বিতর্কের মধ্যেই গত রোববার বিকেলে তাঁকে প্রত্যাহার করে প্রজ্ঞাপন দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ প্রজ্ঞাপনের পর ডিসিকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি করে বিভিন্ন সংগঠন।
ডিসির প্রত্যাহার হওয়ার প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন সোমবার সারওয়ার আলম মাজারে যান। বেলা দুইটার দিকে তাঁর নির্দেশনায় দানবাক্স ও সিলগালা করা ডেকগুলো খোলা হয়। টাকা গণনা শেষে সন্ধ্যায় জানানো হয়, আটটি ডেক ও দানবাক্সে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা নগদ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৭ আনা স্বর্ণালংকার ও ১০ সৌদি রিয়াল মিলেছে। এসব টাকা হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের নামে ব্যাংক হিসাবে রাখা হবে।
টাকা গণনা শেষে সোনালী ব্যাংকের কোর্ট বিল্ডিং শাখায় নতুন একটি ব্যাংক হিসাব চালু করে দানের সমুদয় টাকা জমা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ডিসি সারওয়ার আলম জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে আরও ৫ লাখ টাকা ওই তহবিলে দান হিসেবে জমা দেন। সেদিন রাতে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে পরদিন মঙ্গলবার তিনি সিলেট ছাড়েন।
এদিকে সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিদিনই হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে আসেন। এ সময় তাঁরা টাকাসহ নানা সম্পদ মাজারে দান করেন। তবে মাজারের ৭০০ বছরের ইতিহাসে কখনোই দানের হিসাব প্রকাশ্যে গণনা করা হয়নি। তাই প্রতিদিনের দানের হিসাব অজানাই ছিল। কিন্তু ডিসি গণনার উদ্যোগ নেওয়ার পর টাকার পরিমাণ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। মোটা অঙ্কের এ দান মাজারে আসা সত্ত্বেও মাজার তহবিলে জেলা প্রশাসন থেকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়টি একেবারেই অযৌক্তিক। এ টাকা অন্য জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা যেত।
এ বিষয়ে কথা বলতে বুধবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় সারওয়ার আলমের সঙ্গে। তবে ‘ব্যস্ততা দেখানোয়’ তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলা যায়নি। যদিও জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে মাজার তহবিলে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।
গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের ডিসি হিসেবে নিয়োগ পান সারওয়ার আলম। এর আগে তিনি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। সিলেটের সাদাপাথর লুট ও চুরির ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে তখন জেলা প্রশাসক পর্যায়ে এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সারওয়ার আলম নগরের ফুটপাত উচ্ছেদ, ওসমানী মেডিকেলে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে উদ্যোগ নেওয়াসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ নেন। কিছু ক্ষেত্রে তিনি সফল হন; কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হন। তবে গত বৃহস্পতিবার মাজারের ঐতিহাসিক ডেক সিলগালা করার পর ডিসির পক্ষে-বিপক্ষে সিলেটজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। পরে তাঁকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করা হয়।