
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের আসনগুলোতে বরাবরই ভালো ফল করে আসছিল বিএনপি; কিন্তু ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে হোঁচট খায় দলটি। তখন চারটি আসনেই হেরে গিয়েছিলেন দলের প্রার্থীরা। এবারের ভোটের লড়াইয়ে জিতে আসনগুলো পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি। ভোটাররা বলছেন, লড়াইয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা।
আগামী বৃহস্পতিবার দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরে রয়েছে চারটি।
চট্টগ্রাম নগরের চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩৬ প্রার্থী। ১৭ দলের পাশাপাশি নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। তবে নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
চট্টগ্রাম নগরের চারটি আসনে মোট ভোটার ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ৮১৪ জন। এবার ৫৮২টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে।
তিন আসনে লড়াইয়ের আভাস
চট্টগ্রাম নগরের চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, সাধারণ ভোটার, দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া-চকবাজার), চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-ডবলমুরিং-পাহাড়তলী-খুলশী) এবং চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা-ইপিজেড) আসনে দুই দলের প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। তবে চট্টগ্রাম-৮ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের দুজন প্রার্থী (জামায়াতে ইসলামী ও নাগরিক পার্টি) থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বিএনপির প্রার্থী।
চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ আসন হচ্ছে চট্টগ্রাম-৯। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে, এই আসনে যে দল জেতে, সে দলই সরকার গঠন করে। এখানে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নগরের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম ফজলুল হক। বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান আগে নির্বাচন করলেও এ কে এম ফজলুল হকের এটি প্রথম নির্বাচন।
চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিএনপির শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। বিশেষ করে বাকলিয়ায় দলটির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী আছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থান আছে চকবাজার এলাকায়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বড় দুটি সরকারি কলেজ চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজও এই এলাকায় অবস্থিত। এই কলেজ দুটি জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে।
চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থীই এবার প্রথম নির্বাচন করছেন। বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দলের সভাপতি ও অক্সফোর্ড পড়ুয়া সাঈদ আল নোমান। তিনি বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম নগরের সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী।
বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আল নোমানের বড় শক্তি হচ্ছে দলের শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান এবং প্রয়াত পিতার পরিচ্ছন্ন ইমেজ। জামায়াতে ইসলামীর শক্তি হচ্ছে তাদের প্রার্থী মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী সিটি করপোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আসনের একটি হচ্ছে চট্টগ্রাম-১১। এখানে রয়েছে বন্দর, কাস্টমস, ইপিজেড, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখানে লড়াই হবে সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মধ্যে।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যিনি ১৯৯১ সালের উপনির্বাচন এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে টানা জয়লাভ করেছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ শফিউল আলম। তিনি সিটি করপোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন।
এদিকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হয়েছেন এনসিপির মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ। চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে একমাত্র এই আসনে এনসিপির প্রার্থী রয়েছেন। তবে শুরুতে জামায়াতে ইসলামী বোয়ালখালী উপজেলার নায়েবে আমির মো. আবু নাছেরকে প্রার্থী করেছিল; কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।
অবশ্য প্রতীক বরাদ্দের দুই ঘণ্টা পর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ান মো. আবু নাছের। তবে পরবর্তী সময়ে আবার প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয় হন তিনি। জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরাও তাঁর পক্ষে নির্বাচনী গণসংযোগ চালিয়ে যান। অর্থাৎ জোটের প্রভাব অনেকটাই নিষ্ক্রিয়।
এতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থীর কাছে হেরে গিয়েছিলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি একটি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল। আমরা আমাদের কর্মসূচির কথা বলছি। অন্যদিকে একটি গুপ্ত দল আমাদের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। যারা আইডি কার্ড, বিকাশ নম্বর, বেহেশতের টিকিট নিয়ে নেমেছে।’ বিএনপির পক্ষে ভোটের উৎসব দেখতে পাচ্ছেন জানিয়ে আমীর খসরু বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ গড়তে অতীতের মতো নাগরিকেরা বিএনপিকে বিজয়ী করবেন।
নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করে নগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতি মানুষ দেখেছে। তারা পরিবর্তন চায়। নগরের তিন আসনে দলীয় প্রার্থী ও এক আসনে ঐক্যের প্রার্থী আছেন। তাঁরা ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছেন। অনেক বছর মানুষ ভোট দিতে পারেননি। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে এলে সেটিই হবে বড় বিজয়।
নগর আসনের অতীত ফল
চট্টগ্রাম নগরে একসময় তিনটি আসন ছিল। তবে ২০০৮ সালে একটি আসন বাড়িয়ে চারটি করা হয়। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনের তিনটিতে, ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনের দুটিতে এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনটির তিনটিতেই জিতেছিলেন বিএনপির প্রার্থীরা।
বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম-৮ (বর্তমানে চট্টগ্রাম-১১) প্রার্থী হয়ে জিতেছিলেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে পরে জয়লাভ করেছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও জিতেছিলেন।
চট্টগ্রাম-৯ আসনে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জয়লাভ করেছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান। বর্তমানে চট্টগ্রাম-৮ আসনে (ওই সময় ছিল চট্টগ্রাম-১০) ১৯৯১ সালে জয়লাভ করেছিলেন সিরাজুল ইসলাম এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে জয়লাভ করেছিলেন এম মোরশেদ খান।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করা বিএনপির তিন প্রার্থীকেই মন্ত্রী করা হয়েছিল।