
কুমিল্লার পদুয়া বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে নিহত হয়েছেন ১২ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে হওয়া এ দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বে থাকা গেটম্যানদের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে রেলওয়ে। দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। স্টেশনমাস্টারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
শুধু এ দুর্ঘটনা নয়, রেলকর্মীদের অবহেলায় একের পর এক বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে। কুমিল্লার এ দুর্ঘটনাসহ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে গত আট বছরে আটটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২১৮ জন।
বিশেষজ্ঞরা রেলওয়ের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন, ট্রেন পরিচালনার নিচের স্তরে থাকা কর্মীদের শাস্তি দিয়ে দায় সারে রেলওয়ে। এসব দুর্ঘটনার জন্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পরপরই রেলওয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। এসব তদন্তে বেশির ভাগ সময় দুর্ঘটনার জন্য লোকোমাস্টার (ট্রেনচালক), সহকারী লোকোমাস্টার, গার্ড ও গেটম্যানদের দায়িত্ব অবহেলাকে দায়ী করা হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা রেলওয়ের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন, ট্রেন পরিচালনার নিচের স্তরে থাকা কর্মীদের শাস্তি দিয়ে দায় সারে রেলওয়ে। এসব দুর্ঘটনার জন্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা।
ট্রেন পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে দুটি অঞ্চলে বিভক্ত। একটি অঞ্চল যমুনা নদীর পূর্ব পাশে, যা পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে (ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ বিভাগ) হিসেবে পরিচিত। আর যমুনা নদীর পশ্চিম পাশ নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে গঠিত (রাজশাহী-রংপুর-খুলনা বিভাগ)।
৮ দুর্ঘটনায় ৬৭ জনের মৃত্যু, ‘দায়’ শুধু নিচের সারির কর্মীদের
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ট্রেন দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরবে। ওই দিন ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার পয়েন্টে ঢাকাগামী আন্তনগর এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত হন ১৯ জন। আহত হন অন্তত ৫০ জন। ওই ঘটনায় চালক, সহকারী চালক ও গার্ড সংকেত ভালোভাবে লক্ষ না করায় দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস পেছন থেকে পণ্যবাহী একটি ট্রেনকে ধাক্কা দেয়। কেউ মারা না গেলেও আহত হন অন্তত ৫০ জন। তদন্তে চালকের সংকেত অমান্য করার বিষয় উঠে আসে।
২০২২ সালের ২৯ জুলাই দুপুরে চট্টগ্রামের মিরসরাই বড়তাকিয়া রেলস্টেশনের কাছে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেন পর্যটকবাহী একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয়। এরপর মাইক্রোবাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার ঠেলে নিয়ে যায় ট্রেনটি। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ১১ জন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও ২ জন। আহত হয়েছিলেন ৫ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মাইক্রোবাসের চালক ছাড়া সবাই ছিলেন একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক-শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালক ও গেটম্যানকে দায়ী করে দুটি তদন্ত কমিটি।
গত ৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরবে। ওই দিন ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের আউটার পয়েন্টে ঢাকাগামী আন্তনগর এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত হন ১৯ জন। আহত হন অন্তত ৫০ জন। ওই ঘটনায় চালক, সহকারী চালক ও গার্ড সংকেত ভালোভাবে লক্ষ না করায় দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালের ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের খুলশীর ঝাউতলা রেলক্রসিংয়ে গেটম্যানের অবহেলায় ডেমু ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়।
২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মন্দবাগ স্টেশনে সংঘর্ষ হয় চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ও ঢাকাগামী তূর্ণা নিশিতার। এতে ১৬ যাত্রী প্রাণ হারান। তদন্ত প্রতিবেদনে তূর্ণা নিশিতার চালক ও গার্ডকে দায়ী করা হয়।
কুমিল্লায় এবার ঈদের দিন রাতে দুর্ঘটনা ঘটলেও গত বছর পবিত্র ঈদুল আজহার দুই দিন আগে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল চট্টগ্রামে। গত বছরের ৫ জুন রাতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুর পূর্ব প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা চারটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, দুটি মোটরসাইকেল ও একটি আইসক্রিমবাহী ভ্যানকে ধাক্কা দেয় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা পর্যটক এক্সপ্রেস। এতে মা-বাবার কোলে থাকা দুই বছরের এক শিশুসহ দুজনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছিলেন অন্তত ১৬ জন। এ দুর্ঘটনার জন্য ট্রেনের ট্রেনচালক ও সহকারী ট্রেনচালককে দায়ী করেছিল রেলওয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি।
২০১৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভোরে বারইয়ারহাট রেলক্রসিংয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন একটি যাত্রীবাহী বাসকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যায় প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দুই বাসযাত্রীর। আহত হন আরও ২০ যাত্রী। ট্রেন আসার সময় কোনো প্রতিবন্ধকদণ্ড ফেলা হয়নি। গেটম্যানের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
কুমিল্লার ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে গেটম্যানের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ জানার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে, গেটম্যান ছাড়া আর কাদের গাফিলতি ছিল।
তবে রেলওয়ের এমন তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহনবিশেষজ্ঞ মো. সামছুল হক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও তার জন্য ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত একেবারে নিচু সারির কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যাঁদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, দেখা যাবে তাঁদের কেউ কেউ দু-তিন মাস ধরে বেতনও পান না। কিন্তু ট্রেন দুর্ঘটনার সঙ্গে ওপরের সারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। কেননা, যেসব কমিটি গঠন করা হয়, সেখানে শুধু রেলের কর্মকর্তারা থাকেন। তাঁরাও সহকর্মীদের অবহেলার বিষয়টি তদন্তে এড়িয়ে যান। অথচ অন্যান্য দেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দায় স্বীকার করে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন।
অধ্যাপক মো. সামছুল হক বলেন, যত দিন পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধ করা যাবে না, তত দিন নিচু পর্যায়ের কর্মীদের শাস্তি দিয়ে ট্রেন দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে না। এভাবে চলতে থাকলে উৎসবের সময় বিষাদের ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে থাকবে।
ট্রেনের এ দুর্ঘটনা বর্তমান সরকারের জন্য একটি পরীক্ষা অবহিত করে অধ্যাপক মো. সামছুল হক বলেন, বর্তমান সরকারের সময় এটাই প্রথম বড় ট্রেন দুর্ঘটনা। এখন দেখার বিষয়, সরকার আগের গতানুগতিক পথে হাঁটবে, নাকি দুর্ঘটনা রোধে টেকসই সমাধানে নতুন কিছু করবে। কেননা, বাইরের দেশ তদন্ত করে দুর্ঘটনার মূল কারণ খুঁজে বের করে এবং তার সমাধানে টেকসই উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখানে তার কিছুই হয়নি। তাই টাকা খরচ করার পরও মানুষ নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছেন না। উৎসবের সময় যাত্রাগুলো বিষাদে পরিণত হচ্ছে।
রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, রেলক্রসিংয়ে ট্রেন দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য আন্ডারপাস বা ওভারপাস করা হবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ট্রেন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নির্দেশনা দিয়েছেন। শনিবার রাতের দুর্ঘটনায় গাফিলতির দায়ে ইতিমধ্যে দুজন গেটম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলায় স্টেশনমাস্টারের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কুমিল্লার যে অংশ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে, ওখানে বিএনপির আমলে আন্ডারপাস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি।