লোডশেডিংয়ের মধ্যে পড়ছে এসএসসি পরীক্ষার্থী রাহী। তার মা হাতপাখার বাতাস দিচ্ছেন। শুক্রবার দুপুরে রাজশাহী নগরের কাজলা এলাকায়
লোডশেডিংয়ের মধ্যে পড়ছে এসএসসি পরীক্ষার্থী রাহী। তার মা হাতপাখার বাতাস দিচ্ছেন। শুক্রবার দুপুরে রাজশাহী নগরের কাজলা এলাকায়

মানুষের কথা

লোডশেডিংয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী রাহীর ভরসা মায়ের হাতপাখা

দুই কক্ষের ভাড়া বাড়ি। রাহীর পড়ার ঘরটা বলতে গেলে একটা খুপরি। চারদিকে দেয়ালের ওপরে টিনের চালা। বাতাস ঢোকার মতো বাইরের দিকে জানালা নেই। সামনের দিকে জানালা আছে, তবে সেদিক দিয়ে বাতাস আসার রাস্তা নেই। শুক্রবার ছুটির দিনে সকাল থেকে সেই ঘরে পড়ছে এসএসসি পরীক্ষার্থী রাহী। এর মধ্যে দুপুর পর্যন্ত তিনবার বিদ্যুৎ গেছে। তখন মা যুথী বেগমের হাতপাখার বাতাসেই তার ভরসা করতে হয়েছে।

রাহীরা থাকে রাজশাহী নগরের কাজলা মহল্লায়। বাবা সাঈদ একজন রিকশাচালক। মা যুথী বেগম গৃহিণী। তিনি বাসায় সেলাই মেশিনে মেয়েদের পোশাক তৈরির কাজ করেন। তা থেকে কিছু বাড়ি আয় হয়। কিন্তু বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করায় সংসারে টানাটানি শুরু হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে বাড়িটিতে গিয়ে মনে হলো, রাহীর পড়ার ঘরটির বাতাস যেন আগুনের তাপে ফুটছে। একমুহূর্তের জন্য ফ্যান বন্ধ করলে ঘরের ভেতরে আর বসে থাকা যাচ্ছে না। লোডশেডিংয়ের মধ্যে রাহী তার ভেতরে বসেই পড়ছে। তার মায়ের হাতে একটা পাখা। তিনি পাখা ঘোরাচ্ছেন।

কয়েক দিন থেকেই রাজশাহীতে প্রচণ্ড গরম পড়ছে। শুক্রবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবার যা ছিল সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

রাহী রাজশাহী আলোর পাঠশালা থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। সে জানাল, বুধবার রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমের কারণে ভালো করে ঘুমাতে পারেনি। বৃহস্পতিবার পরীক্ষা দিয়ে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।

রাহী রাজশাহী আলোর পাঠশালা থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে

যুথী বেগম উচ্চ রক্তচাপের রোগী। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ার কারণে ওষুধ খেয়েও ঘুমাতে পারেননি। সারা দিন অসুস্থ বোধ করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটুকু বাসার ভাড়া মাসে তিন হাজার টাকা। এর ওপর দুটি এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া আছে। সেই ঋণের কিস্তি দিতে হয় সপ্তাহে তিন হাজার টাকা।

জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় অনেক হিসাব কষে সংসার চালাতে হচ্ছে যুথী বেগমকে। তিনি বলেন, তাঁরা সপ্তাহে এক দিন মুরগির মাংস খেতেন। সোনালি মুরগি ছিল ২৮০ টাকা কেজি। সেই মুরগি এখন ৩৫০ টাকা হয়েছে। এর পর থেকে সোনালি মুরগি আর খেতে পারেন না। এখন ব্রয়লার মুরগি খেতে হয়। আর বাজারের যে মাছের দাম সবচেয়ে কম, সেই ছোট মাছ কেনেন সপ্তাহে দু-এক দিন।

যুথী বেগম বলেন, যখন এক সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৮০০ টাকা ছিল তখন থেকে তাঁরা গ্যাসের চুলা ব্যবহার করতেন। এখন গ্যাসের একটি সিলিন্ডারের দাম হয়েছে ১ হাজার ৯০০ টাকা। তাই গ্যাসের চুলা তুলে রেখেছেন আর সিলিন্ডার খাটের নিচে রেখে দিয়েছেন। এখন খড়ির চুলায় রান্না করেন। তাঁদের পাঁচ সদস্যের পরিবার। রাহীর একটা ছোট ভাই আছে। মাদ্রাসায় পড়ে। পরিবারে মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন মণ খড়ি লাগে। খরচ পড়ে ৯০০ টাকা।

যুথী বেগম আরও বলেন, তাঁর স্বামী আগে পাইপমিস্ত্রির কাজ করতেন। কিন্তু প্রতিদিন কাজ পাওয়া যেত না। ফলে মাঝেমধ্যেই উপোস থাকার মতো অবস্থা হতো। দেড় বছর আগে ৮৫ হাজার টাকা দিয়ে রিকশা কেনেন। এ জন্য একটা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন ৭০ হাজার টাকা। রিকশার ব্যাটারি ঠিক করতে আরও ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়েছিল। এই ঋণের কিস্তি সপ্তাহে তিন হাজার টাকা। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে রিকশা থেকে আয় কমে গেছে। গরমের কারণে লোকজন খুব সকালে এবং বিকেলের পর ছাড়া বাইরে বের হয় না। বিদ্যুৎসংকটের কারণে সন্ধ্যার পর থেকে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্য সন্ধ্যার পরে আগের চেয়ে মানুষ চলাচল কমে গেছে।

রাহীদের বাসায় যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেই তার বাবা রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আগে দিনে এক হাজার থেকে সাড়ে বারো শ টাকা আয় হতো। এখন ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকার বেশি রোজগার হচ্ছে না। এর ভেতর থেকে দেড় শ টাকা গ্যারেজে চার্জের জন্য দিতে হয়। সব মিলিয়ে সংসারে টানাটানি শুরু হয়ে গেছে।