
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সালমান ওমরের এক কর্মীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার ঘটনায় নেতৃত্ব দেন স্থানীয় দুই ব্যক্তি। স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এ কথা জানিয়েছেন।
ধোবাউড়া উপজেলার এরশাদ বাজারে সালমান ওমরের নির্বাচনী কার্যালয়ের উদ্বোধন নিয়ে কথা–কাটাকাটির জেরে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর কর্মী নজরুল ইসলামকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। তাঁর বাড়ি উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের বাকপাড়া রামসিংহপুর গ্রামে। এ ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে নজরুলের লাশ নিয়ে ধোবাউড়া উপজেলা সদরে বিক্ষোভ করেছেন সালমান ওমরের সমর্থকেরা। এ সময় এই আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
ময়মনসিংহ-১ আসনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গতকাল ঘোষগাঁও ইউনিয়নের এরশাদ বাজারে তাঁর একটি নির্বাচনী কার্যালয়ের উদ্বোধন করা হয়। কার্যালয়টি উদ্বোধনের কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সেখানে হামলা চালায় বিএনপির প্রার্থীর সমর্থক আজহারুল ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে একটি দল। এ সময় কার্যালয়ের সামনে থাকা নজরুল ইসলামকে (৪০) ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া নোমান উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মফিজ উদ্দিনের নাতি। আজহারুল ইসলাম বিএনপির কর্মী। নোমানও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মফিজ উদ্দিন বয়সের কারণে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হলেও এমরান সালেহর বলয়ে রাজনীতি করেন। তাঁর ছেলে ফরহাদ আল রাজী উত্তর জেলা যুবদলের সহসম্পাদক এবং ধোবাউড়া উপজেলা যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী।
জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মফিজ উদ্দিন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনের পর লোকজন চলে যাওয়ার সময় বকাঝকা করতে থাকে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা–কাটাকাটির এক পর্যায়ে সংঘর্ষ হয়। এ সময় আজহারুল গিয়ে পিটাইছে আর আমার নাতি নোমান গিয়ে চাকু দিয়ে আঘাত করে এটি সত্য কথা। যে কাজটি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক, এমনটি হতে পারে না।’
নজরুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় আজহারুল ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল নোমানকেও আসামি করা হয়েছে।
আজ শনিবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের মর্গে নিহত নজরুলের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তাঁর লাশ ধোবাউড়া উপজেলা সদরে নিয়ে আসা হয়। লাশটি প্রথমে ধোবাউড়া থানা রোডে সালমান ওমরের দলীয় কার্যালয়ের সামনে নেওয়া হয়। পরে পৌনে পাঁচটার দিকে লাশবাহী গাড়ি নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলের সামনে ছিলেন নিহত নজরুলের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। এ সময় বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে বিচার দাবি করা হয়।
মিছিলটি বাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে উপজেলা পরিষদের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে মানববন্ধন হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমরের নেতৃত্বে তাঁর সমর্থকেরা কর্মসূচিতে অংশ নেন। মানববন্ধন শেষে উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পরে উপজেলা পরিষদ মাঠে প্রথম জানাজা শেষে লাশ নিহত ব্যক্তির বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে রাত আটটায় জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হবে।
নজরুলের বড় ছেলে মো. সোলাইমান বলেন, ‘আমার বাবা সব সময় মানুষের উপকার করেছেন। কিন্তু আমার বাবাকে হত্যা করা হলো। আমার বাবার খুনিদের ফাঁসি চাই। প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ, আমার বাবার খুনিদের যেন ফাঁসি হয়।’
এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ছেলে মো. সোলাইমান ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২২ জনকে আসামি করে আজ ভোরে থানায় একটি অভিযোগ দেন। পরে অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ধোবাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় গতকাল রাতেই ঘোষগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আদম আলী (৫৪) ও বিএনপির সদস্য মো. দুলাল মিয়াকে (৫৩) গ্রেপ্তার করা হয়। আজ দুপুরে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. ইব্রাহিমকে (৫২) এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিকেলে ময়মনসিংহ আদালতে পাঠানো হয়। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
আজ বিকেল চারটার দিকে এরশাদ বাজারে ঘটনাস্থলে গিয়ে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। ছুরিকাহত হওয়ার পর সড়ক পার হয়ে একটি দোকানের পাশে পড়ে যান নজরুল ইসলাম। সেখানে এখনো রক্ত শুকায়নি। রক্তের দাগ দেখছিলেন বাজারে আসা বাসিন্দারা।
ঘটনাস্থলের পাশের চা–দোকানি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনী অফিস উদ্বোধন শেষে খুরমা বিতরণ হয়। এরপরই নোমানের নেতৃত্বে ধানের শীষের লোকজন এসে বলতে থাকে, এ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কোনো অফিস থাকতে পারবে না। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হলে আমি দোকান বন্ধ করে ফেলি। কে ছুরিকাঘাত করেছে, তা দেখিনি।’