
স্কুলজীবনে সেরা শিক্ষার্থীদের একজন ছিলেন হাসান সরকার। মানসিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর শিকলবন্দীর খবর প্রথম আলোয় প্রকাশের পর অবশেষে তাঁর জীবনে দেখা দিয়েছে আশার আলো। স্থানীয় প্রশাসন, বন্ধুবান্ধব ও বাজারের ব্যবসায়ীদের সহায়তায় নতুন ঘর, প্রয়োজনীয় আসবাব ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে তাঁর জন্য। হাসান এখন শিকলমুক্ত জীবন কাটাচ্ছেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্কুলে ছিলেন সেরাদের একজন, মানসিক সমস্যায় শিকলে বন্দিজীবন হাসানের’ শিরোনামে প্রথম আলোর অনলাইনে এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর এগিয়ে আসে উপজেলা প্রশাসন, হাসানের সহপাঠী বন্ধুরা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
হাসান সরকারের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সবার উদ্যোগে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয়ে হাসানের জন্য আধা পাকা টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ঘরের সঙ্গে শৌচাগারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ঘরের ভেতরে একটি চৌকি, লেপ-তোশক, বালিশ ও বৈদ্যুতিক ফ্যান দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁর জন্য নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থাও শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী ও হাসানের সহপাঠী আবদুল মতিন বলেন, ‘প্রথম আলোয় সংবাদটি প্রকাশের পর বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যতটা পারি আমরা হাসানের পাশে দাঁড়াব। এখন অন্তত হাসান মানুষের মতো একটি ঘরে থাকতে পারছে। তাঁকে শিকলমুক্ত করে চিকিৎসাও আমরা করছি।’
সরেজমিন দেখা যায়, হাসানের জন্য চকচকে আধা পাকা টিনের বেড়া দিয়ে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন টি-শার্ট, লুঙ্গি পরে বাড়ির উঠানে হাঁটাচলা করছেন তিনি। হাসান বলেন, ‘আমি খুব গর্ববোধ করি যে আমার বন্ধুরা আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা সবাই শিক্ষিত এবং এলাকার ভালো মানুষ। তারা চাইছে যেন আমার ঘরবাড়ি এখানে ঠিকভাবে হয় এবং আমি ভালোভাবে থাকতে পারি। আমরা হাইস্কুলে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। আমরা অনেক দিনের বন্ধু। আল্লাহ যদি তৌফিক দেন, তাদের এই সহযোগিতা আমি কখনো ভুলব না।’
হাসানে পাশে দাঁড়ানোয় তাঁর বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন স্বজনেরাও। রান্নার ফাঁকে হাসানের সৎমা সাহেবা বেগমকে বলেন, ‘ছইলটা ভাঙা ঘরোত আছিল। লোহার শিকল দিয়া বান্দি থোছনো। পেপারোত খবর হওয়া ওর চিকিৎসা হওচে, নয়া ঘর করি দিছি। যারা মোর বাবার জন্য এত কিছু করিল আল্লাহ তাঁর ভালো করবে।’
দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকা হাসানকে এখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে এবং তাঁর চিকিৎসা চালু করা হয়েছে। এতে ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছেন শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোনাব্বর হোসেন বলেন, ‘প্রথম আলো প্রকাশিত খবরটি আমার নজরে আসে। এরপর হাসানের জন্য দুই বান্ডিল টিন ও ৬ হাজার টাকা সহায়তা করা হয়েছে এবং তাঁর চিকিৎসার বিষয়টিও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।’