
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেছেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দিচ্ছেন, ভালো কথা। মনে রাখবেন, শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে জনগণের সম্মান ও মর্যাদা আপনারা কিনতে পারবেন না। শেখ হাসিনা মনে করেছিল পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেল দিয়েই বাংলাদেশের মানুষ তাদের সম্মান ও মর্যাদা বিকিয়ে দেবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের মানুষ না খেয়ে থাকতে পারে, তারা তাদের সম্মান ও গৌরব কোনো স্বৈরাচারীর পায়ের নিচে পিষ্ট হতে দেয় না। সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকুন, আমরা মানুষের অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব।’
আজ শনিবার ময়মনসিংহ নগরের রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে ১১-দলীয় ঐক্যের ব্যানারে বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর ময়মনসিংহ অঞ্চল পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক। বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত এই সমাবেশে বিভাগের বিভিন্ন জেলা–উপজেলা থেকে নেতা–কর্মীরা যোগ দেন।
সমাবেশে মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের যে অধিকার, মানুষের যে ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে, সেটা শান্তিপ্রিয় উপায়ে বাস্তবায়ন করবার দাবি জানাচ্ছি। যদি বর্তমান সরকার সেটা করতে ব্যর্থ হয়, আমি আজ ময়মনসিংহের এই কৃষ্ণচূড়া প্রাঙ্গণ থেকে পরিষ্কার বলতে চাই, ১৯৭০ সালে স্বৈরাচারী পাকিস্তানি গোষ্ঠী, তারা যেভাবে বাংলার মানুষের ভোটাধিকার মানতে চায় নাই, যেমনিভাবে শেখ হাসিনা স্বৈরাচারী সরকার বাংলার মানুষের ভোটাধিকারকে হরণ করেছিল, বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলে এ দেশের মানুষের কাছ থেকে তাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। যদি বিএনপি সেই পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের আর ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার পথে হাঁটে, বিএনপি ও তারেক জিয়ার ভিন্ন ভাগ্য হবে না।’
বিএনপির উদ্দেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, ‘৩২ রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু লোক যোগসাজশ করে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য চোরাই পথ আবিষ্কার করেছে। আমি বিএনপিকে বলতে চাই, এই চোরাই পথ দিয়ে যদি আপনারা বাংলাদেশের মানুষের সংস্কারের অভিপ্রায়কে পায়ে ডলবার চেষ্টা করেন, এটা হবে আপনাদের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমাদের প্রধান দাবি, গণভোটের গণরায়কে কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশে নিত্যদিনের জীবনপ্রবাহে যে জনদুর্ভোগ, তা দূর করতে হবে। এখন ক্ষমতায় আছে বিএনপি। ওনারা তো সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পার্লামেন্টে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে তাঁরা দেশ চালাতে চান। ঠিক আছে, আপনারা নির্বাচিত হয়ে যেভাবেই হোক এসে গেছেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন, ফলাফল ম্যানিপুলেশন করেছেন। তারপরও ১১ দল, আমরা প্রায় ১৮০–এর মতো আসন পেতে যাচ্ছিলাম। ফলাফল ঘোষণা হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ সমস্ত মিডিয়াতে ফলাফল ঘোষণা বন্ধ হয়ে গেল। রহস্যজনকভাবে রেজাল্ট ম্যানিপুলেশন করে আমাদেরকে অর্থাৎ বিরোধী দলকে ঠেলে দেওয়া হলো।’
সরকারের উদ্দেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘মালয়েশিয়া-চীন সফর করে কী চুক্তি করেছেন, সংসদকে জানান। আর সমস্ত সমস্যার সমাধান যদি সংসদে না করেন, শতভাগ মানুষের এই আন্দোলন প্রয়োজনে আমরা আবার রাজপথে নিয়ে যেতে বাধ্য হব। যখন ডাক আসবে, ময়মনসিংহের এই সিংহপুরুষেরা ১১ দলের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে আমাদের সমস্ত মানুষের জীবন, হাজার হাজার মানুষের রক্তাক্ত জুলাই সনদকে, গণভোটের রায়কে আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। তারা আমাদের জুলাই সনদ মানল, কিন্তু গণভোট মানল না। জনগণ যে হাতে ভোট দিয়েছে, সেই জনগণের রায় মেনে গণভোটের রায় কার্যকর করুন।’
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগে দেখেছি, আমাদের যিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তিনি বলেছিলেন—আপনারা সবাই গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিবেন। কিন্তু নির্বাচনের পরে সেই গণভোটের কাজ বাস্তবায়নের জন্য যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হওয়ার কথা, সেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ তাঁরা নিলেন না। এই জাতির সাথে, এ দেশের জনগণের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দিনে-রাত্রে প্রতারণা করে তাঁরা সরকার চালিয়ে যাচ্ছেন। তারপরও বাংলাদেশ যেহেতু একটা দীর্ঘ সময় কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। জাতীয় সংসদের বিরোধী দল একসাথে দেশের স্বার্থে কাজ করার কথা বলেছে। সরকারকে সহযোগিতা করার কথাও বলেছে। কিন্তু আমরা দেখি, এই সরকার শুধুমাত্র আমাদের জনগণের ভোটের রায়ের সাথে যে প্রতারণা করেছে তা না, তারা দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। গত ১৭ বছরের গুম–খুন ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে খুনের বিচার নাই। যারা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল, তাদের সাথে সমঝোতা করে সরকার রাজনীতি করছে।’
বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না বলেও রেকর্ড পরিমাণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘নির্বাচনের মাত্র চার-পাঁচ মাস হলো। এর মধ্যে রেকর্ড পরিমাণে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আগে আমার দেশের জনগণ, আমার দেশের মেহেনতি মানুষ যে বাজার ১০০ টাকা দিয়ে করত, সেই বাজার এখন ১৫০ টাকা দিয়ে করতে হচ্ছে। সুতরাং এই সময়ে বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, কতটুকু তারা সফল হবে, সেইটা কিন্তু আমাদের সবার দেখা হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ অনেক অত্যাচার, অনিয়ম, অন্যায় করেছে। তাদের পতন শুধুমাত্র অত্যাচার, অন্যায়–অনিয়মের জন্য হয়নি। তাদের পতন হয়েছে দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দেশের অর্থনীতির খাতকে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য। এই সরকারও সেই একই পথে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে। সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলে বিরোধী জোট হিসেবে জনগণের পক্ষে আমাদের দাঁড়াতে হতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফর করলেন। আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে তাঁর পেজে অনেক ধরনের গান-টান শুনলাম। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটা দুই-তিন বছর ধরে বন্ধ। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী গিয়ে আসলেন। আমরা ধরে নিয়েছিলাম শ্রমবাজারটা খোলার ঘোষণাটা আসবে। তিনি সেটাও করতে পারলেন না। তিনি চীন গেলেন। সেখানেও আমরা মিডিয়াতে অনেক লোক দেখলাম, অনেক কিছু দেখলাম, অনেক কথা শুনলাম। কিন্তু আমার দেশের জনগণের জন্য কী নিয়ে আসলেন? এই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য, স্পষ্ট কিছু আমরা দেখলাম না। আপনি যদি শো–অফ করার জন্য ঘুরতে যেতে চান, তাহলে সেটা অন্য কথা। সেটা আপনি করতে পারেন, সমস্যা নেই। দেশের জনগণের জন্য কিছু নিয়ে আসতে পারলেন না, পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে—সেটার প্রমাণ জনগণ পেল।’
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নেজামে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সোবহানী, খেলাফত মজলিসের আমির আবদুল বাছিত আজাদ, আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ, ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসান প্রমুখ।