রাঙামাটি শহরের একটি বিদ্যালয়। আজ সকালে তোলা
রাঙামাটি শহরের একটি বিদ্যালয়। আজ সকালে তোলা

বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন একজন, দাপ্তরিক কাজ-পাঠদান সবই করেন তিনি

সকাল গড়িয়ে দুপুর। বিদ্যালয়ের বারান্দায় বসে আছে কয়েকটি শিশু। শ্রেণিকক্ষ খোলা, তবে নেই শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের কেউ আড্ডা দিচ্ছে, আবার কেউ করছে হইচই। সম্প্রতি রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলার দুমদম্যা ইউনিয়নের ভুয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় এ চিত্র।

বিদ্যালয়টিতে জনবল বলতে রয়েছেন মাত্র একজন সহকারী শিক্ষক। তিনিই একই সঙ্গে পাঠদান, দাপ্তরিক কাজ—সবই করেন। অথচ বিদ্যালয়টিতে সরকারিভাবে শিক্ষক থাকার কথা চারজন। থাকার কথা দপ্তরিও।

বিদ্যালয়টির শিক্ষক লালপার পাংখোয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকেই দপ্তরি, সহকারী ও প্রধান শিক্ষকের সব কাজ করতে হয়। উপজেলা সদরে কোনো সভায় গেলে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঠ দেওয়া খুবই কঠিন।’

রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০৭টি। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ৩০৫টিতে। বাকি ৪০২টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এই ৭০৭ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩ হাজার ৩৩২টি। এর মধ্যে ৫৮৯টি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৯৯১টি।

এসব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে অভিভাবকদের মধ্যেও। স্থানীয় ১৫০ নম্বর দুমদুম্যা মৌজার হেডম্যান থাংলিয়ানা পাংখোয়া বলেন, ‘শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে না। এতে শিশুরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে। দ্রুত সংকট দূর না হলে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা বাড়বে।’

অবশ্য শুধু ভুয়াতলী নয়। জেলার দুর্গম উপজেলা থেকে সদর—প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ই চলছে শিক্ষকসংকট নিয়ে। কোনো বিদ্যালয়ে একজন আবার কোনো বিদ্যালয়ে রয়েছেন মাত্র দুজন শিক্ষক।

রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০৭টি। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ৩০৫টিতে। বাকি ৪০২টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এই ৭০৭ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩ হাজার ৩৩২টি। এর মধ্যে ৫৮৯টি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৯৯১টি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পাঁচ বছর ধরে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অধিকাংশ পদ ফাঁকা। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ৭৭ হাজার ২৮৭ জন।

দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পদগুলো শূন্য রয়েছে। এত শূন্য পদ রেখে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব নয়। জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন।
মানস মুকুল চাকমা, সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, রাঙামাটি।

রাঙামাটিতে মোট উপজেলা রয়েছে ১০টি। এর মধ্যে দুর্গম পাহাড়ি উপজেলাগুলোতেই শূন্য পদ বেশি। এসব উপজেলায় সাক্ষরতার হারও কম। জেলার সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৮৯টি। এসব বিদ্যালয়ের জন্য অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদ ৮৯টি হলেও কর্মরত আছেন ৫২ জন; অর্থাৎ শূন্য পদ ৩৭টি পদ। আবার সহকারী শিক্ষক পদে শূন্য রয়েছে ৪৯টি। এ উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৮০ দশমিক ৫১, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৩।

কাউখালী উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৩২টি। আর সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ ২৪৫টি। উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৪২। নানিয়ারচরে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ৩১টি। এ উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৫০ দশমিক ৪০। বরকল উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ৩০টি। এ উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৯৩। জুরাছড়িতে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ৩৯টি। সহকারী শিক্ষকের শূন্য রয়েছে ৬৬টি পদ। উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৬৪ দশমিক ৮৪।

অন্যদিকে লংগদু উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৭৪টি। এতে প্রধান শিক্ষক পদ খালি ৫৪টি। আর সহকারী শিক্ষকের পদ খালি ৭৭টি। এ উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৫২। বাঘাইছড়িতেও ১১৬টি বিদ্যালয়ের ৮০টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। আবার সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য ১১৫টি। এ উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৫৪। একই অবস্থা কাপ্তাই, রাজস্থলী ও বিলাইছড়িতেও। এ তিন উপজেলায় শূন্য রয়েছে ৯৯টি পদ। এসব উপজেলায় সাক্ষরতার হার ৩৩ থেকে ৭৭।

জানতে চাইলে বরকল ও জুরাছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা প্রশিক্ষণ সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক মোরশেদুল আলম বলেন, ‘এক থেকে তিনজন শিক্ষক দিয়ে প্রাক্-প্রাথমিকের দুই শ্রেণিসহ সাতটি শ্রেণি চালানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। প্রধান শিক্ষক মিটিং বা দাপ্তরিক কাজে গেলে একজন শিক্ষককেই সব সামলাতে হয়।’

শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করেন রাঙামাটি সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মানস মুকুল চাকমা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পদগুলো শূন্য রয়েছে। এত শূন্য পদ রেখে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব নয়। জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন।’

জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য ও শিক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বৈশালী চাকমা বলেন, জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। তাঁরা সংকট নিরসনের চেষ্টা করছেন।