
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বড়মাছিমপুর গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে বাঁশের তৈরি কুলা ও হাঁস-মুরগির খাঁচার সারি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামের উঠানগুলো মুখর থাকে এসব পণ্য তৈরির কাজে। প্রায় ৫০টি হিন্দু পরিবার বংশপরম্পরায় বাঁশের তৈরি কুলা, খাঁচাসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার দাবি, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা প্রায় দেড় শ বছর আগে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হন। সময়ের সঙ্গে নানা পরিবর্তন এলেও তাঁরা এখনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই এ কাজে অংশ নেন। কেউ বাঁশ কাটেন, কেউ ফালি করেন, কেউ কুলা বা খাঁচা বোনেন, আবার কেউ প্লাস্টিকের রঙিন বা সাদা সুতা দিয়ে বাঁধাই করেন।
প্রায় ৪৮ বছর ধরে বাঁশের কুলা ও হাঁস-মুরগির খাঁচা তৈরি করছেন বড়মাছিমপুর গ্রামের বাসিন্দা নিখিল চন্দ্র নমসোধ (৫৮)। তাঁর বাবা লাল মোহন নমসোধ ও দাদা ঈশান চন্দ্র নমসোধও একই পেশায় ছিলেন। তাঁদের দেখে দেখেই কাজ শিখেছেন। তাঁর দাবি, এ পেশার আয়েই চার ছেলে, দুই মেয়ে, স্ত্রীসহ আট সদস্যের সংসার চালিয়েছেন এবং সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন করেছেন।
একই গ্রামের মিলন চন্দ্র নমসোধ বলেন, বাবা-দাদার পেশাই ধরে রেখেছেন। বাঁশের তৈরি কুলা ও খাঁচা বিক্রির আয়েই সংসার চলে। এ আয়ের টাকায় এক ছেলে উত্তম চন্দ্র নমসোধকে বাহরাইনে পাঠিয়েছেন। অন্য সন্তানদেরও লেখাপড়া করাচ্ছেন।
গ্রামের আরেক বাসিন্দা নিতাই চন্দ্র নমসোধ বলেন, বাঁশের তৈরি সামগ্রী বিক্রির আয়ে তাঁদের সন্তানেরা লেখাপড়া করছে, কেউ কেউ বিদেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। বড় ছেলে মানিক চন্দ্র নমসোধকে পড়াশোনা করিয়ে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। ছোট ছেলে জীবন চন্দ্র নমসোধ সেলুনে কাজ করেন। মেয়ে লক্ষ্মী রানী নমসোধের লেখাপড়া শেষ করে বিয়ে দিয়েছেন।
নিতাইয়ের স্ত্রী কানন রানী নমসোধ বলেন, বিয়ের পর থেকেই সংসারের কাজের পাশাপাশি স্বামীর সঙ্গে দিন-রাত কুলা ও হাঁস-মুরগির খাঁচা তৈরির কাজ করছেন। তাঁদের মতে, এই ঐতিহ্যবাহী পেশা শুধু পরিবারের জীবিকা নয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গ্রামের বাসিন্দা লাঞ্চনা রানী নমসোধ (৬৫) বলেন, ১০ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। এরপরও তিনি এই পেশা ছাড়েননি।
গৃহবধূ সুচরিতা রানী নমসোধ, শিখা রানী নমসোধ, নমিতা রানী নমসোধ, মিনা রানী নমসোধ ও মিনু রানী নমসোধ বলেন, বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসে তাঁরাও এই কাজে যুক্ত হয়েছেন। এতে সংসারের আয় বেড়েছে এবং পরিবার আরও সচ্ছল হয়েছে।
নিতাই চন্দ্র নমসোধ জানান, স্থানীয় মাছিমপুর বাজার থেকে প্রতিটি বাঁশ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় কিনতে হয়। একটি বাঁশ দিয়ে ১৫ থেকে ১৮টি হাঁস-মুরগির খাঁচা অথবা ২৫ থেকে ৩০টি কুলা তৈরি করা যায়। একজন কারিগরের একটি বাঁশের সব পণ্য তৈরি করতে পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে।
গ্রামের কারিগরদের তৈরি কুলা, ডালা ও হাঁস-মুরগির খাঁচা স্থানীয় বাজার ছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হয়। ব্যবসায়ীরা গ্রামে এসে পাইকারি দামে এসব পণ্য কিনে নিয়ে যান। তবে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্লাস্টিকের পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পেলে এই শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আশা তাঁদের।
গতকাল রোববার সরেজমিনে কথা হয় হোমনা উপজেলার রাজাকাশিপুর গ্রামের ব্যবসায়ী রিপন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, বছরজুড়ে বড়মাছিমপুর গ্রামের কারিগরদের কাছ থেকে পাইকারি দামে কুলা ও হাঁস-মুরগির খাঁচা কিনে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। তাঁর মতো আরও অনেক ব্যবসায়ী এখান থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন।
ওই ব্যবসায়ী জানান, একটি কুলা ১৫০ টাকা, বড় হাঁস-মুরগির খাঁচা ১৮০ টাকা, মাঝারি খাঁচা ১৩০ টাকা এবং ছোট খাঁচা ৮০ টাকায় কিনে তিতাস, হোমনা, মুরাদনগর, মেঘনা, দাউদকান্দিসহ বিভিন্ন উপজেলার বাজার এবং ওরস-মাহফিল ও মেলায় খুচরা বিক্রি করেন।
স্থানীয় দোকানদার রবিউল বলেন, বড়মাছিমপুর গ্রামের কারিগরদের তৈরি বাঁশের সামগ্রী গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। তাঁদের পরিশ্রম ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে যেমন বহু পরিবারের জীবন বদলাচ্ছে, তেমনি টিকে আছে বাংলার শতবর্ষী লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য।
তিতাস উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুর রহমান বলেন, বড়মাছিমপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার নিজেদের শ্রমে বাঁশশিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। কারিগরেরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা সহযোগিতার জন্য উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে যথাসাধ্য সহায়তা করা হবে।