
থোকায় থোকায় ঝুলে আছে আঙুর—এমন দৃশ্য চোখে পড়লে মনে হবে বিদেশে আঙুর চাষের দৃশ্য। দেশের মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশি জাতের আঙুর চাষ করছেন গাজীপুরের মো. রোকনুজ্জামান (৬০)। তিনি এক বিঘা জমিতে ‘বাইকুনুর’ জাতের আঙুর চাষ করে আলোচনায় এসেছেন। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তাঁর আঙুরবাগান দেখতে আসেন।
রোকনুজ্জামানের বাড়ি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোগরা এলাকায়। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী। গাজীপুর মহানগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বিপ্রবর্থা গ্রামে প্রায় পাঁচ একর জমি ইজারা নিয়ে তিনি মালটা, ড্রাগন ফল ও প্যাশন চাষ করে আগেই সফলতা পেয়েছেন। এরপর সেখানকার এক বিঘা জমিতে বিদেশি জাতের আঙুরের চাষ শুরু করেন। বর্তমানে ওই জমিতে প্রায় দুই শতাধিক গাছে ঝুলছে সবুজ রঙের আঙুরের থোকা। এখনো বিক্রির উপযোগী না হলেও ফলন ভালো হওয়ায় পাইকাররা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
বাগান–সংশ্লিষ্টরা জানান, মাত্র এক মাস পর ফলগুলো বেগুনি রং ধারণ করবে এবং খাওয়ার উপযোগী হবে। স্বাদে মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারেও এই আঙুরের ভালো চাহিদা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আঙুরবাগানের পরিচর্যাকারী ও ব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, এই জাতের আঙুরগাছে ফেব্রুয়ারি মাসে ফুল আসে। চার মাসেই আঙুর খাওয়ার উপযোগী হয়। অন্যান্য ফসলের মতোই এই আঙুর চাষে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়।
বাগান দেখতে আসা স্থানীয় ফয়সাল হোসেন বলেন, ‘ফেসবুকে এই বাগানের ছবি দেখে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু বাগানে এসে দেখলাম, গাজীপুরেও এত সুন্দর আঙুর চাষ সম্ভব। ফলন দেখে আমরা মুগ্ধ। এখান থেকে চারা নিয়ে চাষ করার কথা ভাবছি।’
রোকনুজ্জামান বলেন, ‘করোনা মহামারির সময় থেকেই পেশাগত কাজের পাশাপাশি কৃষির দিকে ঝুঁকে পড়ি। শুরুতে বিভিন্ন ফলের চাষ করলেও এবার আঙুর নিয়ে কাজ শুরু করি। এক বিঘা জমি তৈরি, চারা রোপণ ও পরিচর্যা মিলিয়ে প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এই মৌসুমে আনুমানিক দেড় থেকে দুই টন আঙুর হবে। যাবতীয় খরচ বাদে প্রথমবার প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ হবে আশা করছি। এরপর প্রতিবছর একবার করে অন্তত ২০ বছর এসব গাছ থেকে নিয়মিত ফলন পাওয়া যাবে।’
নতুন কৃষি উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে রোকনুজ্জামান বলেন, তরুণদের জন্য কৃষি খাত সম্ভাবনাময়। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে কৃষির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। বেকারত্ব দূর করতে তিনি তরুণদের কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন।
গাজীপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসিবুল হাসান বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে বাগানটি পরিদর্শন করেছি। রোকনুজ্জামান আগে থেকেই ড্রাগন ফল চাষে সফল ছিলেন। এবার তিনি বাণিজ্যিকভাবে আঙুর উৎপাদন শুরু করেছেন। আমরা নিয়মিত তাঁর বাগানের খোঁজখবর রাখছি। আঙুর উৎপাদনের পরিমাণ ও বাজারজাতকরণের বিষয়টিও পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, আঙুর চাষে দোআঁশ ও লাল মাটি, জৈব সারসমৃদ্ধ কাঁকর মাটি কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলের পাললিক মাটি সবচেয়ে উপযোগী। এ ধরনের চাষে জমি অবশ্যই উঁচু হতে হবে, যাতে পানি জমে না থাকে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সূর্যের আলো আসে এমন জায়গা আঙুর চাষের জন্য আদর্শ। এ ধরনের কৃষি উদ্যোগ দেশব্যাপী বিস্তৃত করা গেলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।
গাজীপুরের বাসিন্দা ও কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু নতুন ফসলের সম্ভাবনাই তৈরি করছে না, বরং দেশের কৃষিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। যথাযথ সহায়তা ও পরিকল্পনা থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ আরও বিস্তৃত হতে পারে।