রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ছাত্রলীগের কর্মসূচি চলছে, সুযোগ পাচ্ছে না ছাত্রদল

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ফাইল ছবি

৯ বছর ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা চলছে। বিভিন্ন সময় ছাত্রসংগঠনগুলো এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে এলেও তা এখনো তুলে নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই সময়ে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেননি বলে অভিযোগ সংগঠনটির নেতাদের।

তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার নামে প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছাত্রলীগ ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে ঠিকই তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাঁদের মিছিল–সমাবেশ করতে বাধা দেওয়া হয় না।

ছাত্রলীগের প্রতি প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকেরা। দ্রুত ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সহাবস্থান নিশ্চিতেরও দাবি জানান তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনগুলোসহ একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যাকালীন কোর্স ও একাডেমিক বর্ধিত ফি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ওই দিন আন্দোলনকে প্রতিহত করতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ‘ছাত্রলীগ ও পুলিশ’। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এ ঘটনায় ওই দিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। এর ২৮ দিন পর ক্যাম্পাস খোলা হয়। একই বছরের ৩ মার্চ সিন্ডিকেট মিটিংয়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে সব ধরনের মিছিল, সমাবেশ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম চলছে বলে দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কেউ আর এখন অনুমতির ধারধারে না। ইচ্ছেমতো কর্মসূচি পালন করে। তবে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি জানেন না। পরবর্তী সময়ে মিটিং হলে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।

ছাত্রদলকে অনুমতি না দেওয়ার অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক আসাবুল হক বলেন, ‘সম্প্রতি ছাত্রদল ক্যাম্পাসে ইফতার মাহফিল করল, এ বিষয়ে আমাদের অনুমতি নেয়নি। বছরখানেক আগে কর্মসূচি পালনের জন্য নিরাপত্তা চেয়ে মুঠোফোনে কল করে অনুমতি চেয়েছিল। তখন তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এরপর তাঁরা আর কোনো কর্মসূচির জন্য অনুমতি চায়নি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তারের কাছে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অবগত নই। জেনে তারপর কথা বলব।’ এরপর তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

কোনো ছাত্রসংগঠনের যদি মূল উদ্দেশ্য হয় শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা, তাহলে সে সংগঠনের জন্য এ নিষেধাজ্ঞা কোনো বাধা নয় বলে মন্তব্য করেন বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাকিল হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করে ছাত্রসংগঠনগুলো। তাদের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আটকানো উচিত নয়।

ছাত্রদলের মিছিল-সমাবেশ করার সক্ষমতা নেই মন্তব্য করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পরবর্তী সময়ে দেশের নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। যদি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাহলে দেশ নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়বে। এটা থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল মিঠু প্রথম আলোকে বলেন, ‘হলের সিট–বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের মারধরসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করতে গেলে প্রশাসন আমাদের অনুমতি দেয়নি। প্রশাসন সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। ছাত্রলীগ মিটিং–মিছিল করলে তাদের বাধা দেওয়া হয় না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দপ্তর ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৯ এপ্রিল রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয় ছাত্রদল। উপাচার্যের পক্ষে প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান এ স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন নিয়ে ২০১৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বেশ কয়েকটি ধাপে ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সময় ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্রসংগঠনও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

প্রশাসনের সব ছাত্রসংগঠনকে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন রাকসুর সমন্বয়ক আবদুল মজিদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রশাসন কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে ডেকে মিটিং-মিছিল করতে বলবে না। সংগঠনগুলোর কর্মসূচি পালনের সক্ষমতা থাকতে হবে।

ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. মাসুদুল হাসান খান। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা উপাচার্য মহোদয়ের সঙ্গে অনেকবার কথা বলেছি। তিনি বারবার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রশাসন ঠিকই ছাত্রলীগ ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এভাবে পক্ষপাতমূলক আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি চলছে। এটা কতটুকু ফলপ্রসূ, তা প্রশ্নের বিষয়। রাকসু চালু করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের বিপদে পাশে থাকে ও অধিকার আদায়ে সোচ্চার—এমন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। প্রশাসনের উচিত সেই পরিবেশ সৃষ্টি করে দেওয়া।