
ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি উজান থেকে আসা ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরাঞ্চলে বিস্তৃত এলাকার ধানখেত তলিয়ে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন এসব অঞ্চলের কৃষকেরা। পরিস্থিতি এমনটা থাকলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাঁরা।
জলাবদ্ধতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরাঞ্চলের কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। বন্যার শঙ্কায় অনেকে কষ্ট করে হলেও আধা পাকা ধান ঘরে তুলছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগগুলোর সূত্রে জানা গেছে, এসব এলাকার হাওরাঞ্চলের প্রায় অর্ধেক ধান এখনো কৃষকদের ঘরে ওঠেনি।
এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে পাঁচ জেলায় বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ জেলার মধ্যে মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনায় বন্যা শুরু হয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জ বন্যার ঝুঁকিতে। কারণ, ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে এসব জেলার নদ-নদীর পানি বাড়ছে। কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করছে।
সুনামগঞ্জে ২৫ হাওরে ব্যাপক ক্ষতি
সুনামগঞ্জে গত কয়েক দিনের অতি ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে অন্তত ২৫টি হাওরের বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলার হাওরগুলোর অর্ধেক ধান এখনো কাটা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় লোকজন বলছেন, বড় ক্ষতি হয়েছে গত দুই দিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে। পানিতে ফসলের খেত তলিয়ে তো গেছেই, পাশাপাশি রোদের অভাবে শুকাতে না পারার কারণে মাড়াই করা ধানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন হাওরে ৭ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও অন্তত ২ হাজার ৪৭ হেক্টরের ফসল। তবে এই হিসাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন হাওর আন্দোলনের সঙ্গে মানুষেরা। তাঁরা বলেছেন, এই হিসাবের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। হাওরে থাকা প্রায় ৫০ ভাগ ধানের ক্ষতি হয়েছে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাওরের অর্ধেক ধানই কাটা যায়নি। কৃষি বিভাগ আন্দাজে কথা বলে। জেলার প্রায় সব হাওরে জলাবদ্ধতা ছিল। এখন অতিবৃষ্টি ও ঢলে সব হাওরে থই থই পানি। পানি বাড়বে। তাই কৃষকেরা তলিয়ে যাওয়া ধান কাটতে পারবেন না।’ তাঁর দাবি, জেলার বড় বড় হাওরের ধান তলিয়ে গেছে। এই সংখ্যা অন্তত ২৫টি হবে।
‘ইবার ধান পাইলাম না’
গতকাল বুধবার দুপুরে সদরের ইসলামপুর গ্রামে দেখা যায়, উঁচু জমিতে একা ধান কাটছেন কৃষক বশির মিয়া। তিনি জানান, এই ধানের জমি উঁচু। এই ধান সাধারণত সব শেষে তাঁরা কাটেন। কিন্তু এবার আগেই পানি এসে সেই ধান তলিয়ে দিয়েছে। তাই চেষ্টা করছেন যা পারেন কেটে তোলার। এই কৃষক বলেন, ‘ধান কাটার শ্রমিকও নাই। হাওরের পানিতে মেশিনও চলে না। সব দিক দিয়ে আমরা বিপদে পড়ছি।’
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৫৬ সেন্টিমিটার। শুধু সুরমা নয়, জেলার কুশিয়ারা, নলজুর, পাটলাই, যাদুকাটা, খাসিয়ামারা, বৌলাইসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর নদীর এ পানি প্রবেশ করছে হাওরে। এতে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।
সদরের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আলা উদ্দিন দেখার হাওরে ১৭ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। জলাবদ্ধতায় ছয় বিঘার ফসল নষ্ট হয়েছে। তুলেছেন চার বিঘা। বাকি সাত বিঘা তলিয়ে গেছে। কাটা ধান মাড়াই করে বস্তায় ভরে রেখেছিলেন। সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।
আলা উদ্দিন বলেন, ‘খেতের ধান তো গেছেই, এখন খলার (বস্তা করে রাখা) ধান নষ্ট অইছে। ইটার লাগি বেশি কষ্ট লাগে।’ তাঁর স্ত্রী ইয়ারুননেসা বলেন, ‘ইতা ধানে কোনো কাম অইত না। ইবার ধান পাইলাম না। আমরা কিলা চলতাম। চলার তো কোনা উপায় নাই।’
‘কৃষকদের সর্বনাশ হয়ে যাবে’
কিশোরগঞ্জের নিকলীর সিংপুরের কৃষক আবদুল কাদির মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁর প্রায় এক একর ধানখেত ভেসে থাকতে দেখেছিলেন। গতকাল ধান কাটবেন বলে শ্রমিক ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু সকালে দেখেন, তাঁর সব খেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধান আর কাটা হয়নি। কৃষক ইদ্রিস আলীর দেড় একর জমিরও বেশির ভাগ তলিয়ে গেছে। যেটুকু জমি ভেসে আছে, সেটুকুও শ্রমিকসংকটে কাটাতে পারছেন না।
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী, তাড়াইল ও করিমগঞ্জ উপজেলায় বিস্তীর্ণ হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত জেলার ছয়টি উপজেলায় ২ হাজার ৩৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে কৃষকদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত করিমগঞ্জ, নিকলী, ইটনা ও তাড়াইলের কিছু অংশ ঘুরে দেখা গেছে, অনেক পাকা ও আধা পাকা জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। সিংপুর এলাকার কৃষক আবদুল কাদির বলেন, চোখের সামনে কৃষকের হাজার হাজার হেক্টর জমির স্বপ্নের ফসল তলিয়ে গেছে। দ্রুত পানি সরে না গেলে কৃষকদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, হাওরের পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও ইটনার ধনু-বৌলাই নদ, করিমগঞ্জের মগড়া নদী, অষ্টগ্রামের কালনী নদী ও ভৈরবের মেঘনা নদীতে পানি বেড়েছে। এতে ফসলের আরও ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, হাওরে ধান কাটা ও মাড়াই মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া আর প্রবল বৃষ্টি কৃষকদের ফসল তোলায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টি চলমান থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
পানি বাড়ছেই, আরও ক্ষতির শঙ্কা
নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কংস নদ, সোমেশ্বরী ও মগড়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খালিয়াজুরির ধনু, কলমাকান্দার উব্দাখালি ও মহাদেও নদ–নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। অব্যাহত বৃষ্টিতে কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি ও মদন উপজেলার বেশ কয়েকটি হাওরে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ধানখেত তলিয়ে যাচ্ছে।
খালিয়াজুরির জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘ননদের পেটনা হাওরে আমার সব ধান পানির তলে। আজই সকালে ঘুম থাইক্কা উইঠ্ঠা দেহি পুরা হাওরডার ধান পানিতে ডুইব্বা গেছে। আর দুই সপ্তাহ সময় দিলেই কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতে পারত।’
পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে ফসলের আরও ক্ষতির শঙ্কায় কৃষকেরা। তাঁরা বলছেন, হাওরে এখনো অর্ধেক ধান কাটা হয়নি। এসব ফসল সময়মতো তুলতে না পারলে বড় বিপর্যয় নেমে আসবে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাওরে এখনো সব কটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। তবে খুবই চিন্তায় আছি। কারণ, পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছে। পানি আরও বেড়ে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।’
প্রতিদিনই তলিয়ে যাচ্ছে ধানখেত
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের হাওরগুলোয় পানি বেড়েছে। ধানখেত তলিয়ে যাওয়ায় ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। এদিকে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার নদ-নদীগুলোর পানিও বেড়েছে। ইতিমধ্যে জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল জেলার হাওরাঞ্চলে ৫০০ হেক্টরের বেশি ফসলের খেত নতুন করে পানিতে তলিয়ে গেছে। যদিও কৃষি বিভাগের দাবি, হাওরের ৮২ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে। পাউবো সূত্রে জানা গেছে, মনু, ধলাইসহ জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোতে পানি বেড়েছে। হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরেও পানি বেড়েছে। হাওরের নিচু অংশে অনেক জমির ধান তলিয়ে গেছে।
‘কিছুই করতে পারলাম না’
দুই দিনের বৃষ্টিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রায় তিন হাজার বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নাসিরনগর উপজেলা। নাসিরনগর সদরের মেদির হাওরে ৪০০ থেকে ৫০০ বিঘা (৫৪ থেকে ৬৭ হেক্টর) ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি না কমলে ফসলের আরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
মেদির হাওরে সাত বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন কৃষক জহির মিয়া। তিনি জানান, তাঁর সব জমির ধানই এখন পানির নিচে। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে হাওরে সড়ক হওয়ার পর থেকে বৃষ্টি হলে পানি আর সরে না বলে জানান তিনি।
খলিলুর রহমান নামের আরেক কৃষক বলেন, মেদির হাওরে ছয় বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। ধান কাটাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে ঝড়বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বাকি ধান তুলতে পারেননি। সেসব ধানখেত এখন পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনেই ধানগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি, কিছুই করতে পারলাম না।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন খলিল রহমান, সুনামগঞ্জ; তাফসিলুল আজিজ, কিশোরগঞ্জ; পল্লব চক্রবর্তী, নেত্রকোনা; আকমল হোসেন, মৌলভীবাজার ও শাহাদৎ হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া]