তেলের জন্য দাঁড়িয়ে আছে ছোট-বড় বিভিন্ন জাহাজ। এমন ৫০টির বেশি জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে নদীতে। গত মঙ্গলবার মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে
তেলের জন্য দাঁড়িয়ে আছে ছোট-বড় বিভিন্ন জাহাজ। এমন ৫০টির বেশি জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে নদীতে। গত মঙ্গলবার মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে

নৌপথে পণ্য পরিবহনেও জ্বালানিসংকটের ধাক্কা

মুন্সিগঞ্জের মেঘনা ঘাটের পাশে ও মেঘনা নদীতে মঙ্গলবার দেখা যায়, জ্বালানির সংকটে দাঁড়িয়ে আছে ৫০টির বেশি কোস্টার, লাইটার জাহাজ ও বাল্কহেড। এই লাইটার জাহাজগুলো নৌপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনের কাজে যুক্ত। পরিবহন করে ইট ও ক্লিংকার, সিমেন্ট, ফ্লাই অ্যাশসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল। এ ছাড়া দেশীয় এবং বিদেশ থেকে আনা ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সারসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহের কাজেও যুক্ত এসব পরিবহন।

মেঘনা ঘাটের পাশেই মঙ্গলবার দুপুরে কথা হয় এমভি টিকলি কার্গো জাহাজের মাস্টার আজমল শেখের সঙ্গে। তিনি গত ৩১ মার্চ মেঘনা ঘাটের পাশে তাঁর লাইটার জাহাজটি নোঙর করেন। এসেছেন ভারতের কলকাতা বন্দর থেকে।

আজমল জানান, এমভি টিকলি নিয়মিত ভারতের বিভিন্ন বন্দর থেকে কাঁচামাল পরিবহনের কাজে যুক্ত। দেশের বিভিন্ন সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে ফ্লাই অ্যাশ খালাস হলে তিনি জ্বালানি নিয়ে আবার ভারতের উদ্দেশে যাবেন। কিন্তু কোথাও তেল পাচ্ছেন না। বাড়তি দাম দিতে চেয়েও তেল পাচ্ছেন না।

আজমল শেখ বলেন, কেউ তেল দিচ্ছে না। যারা তেল সরবরাহ করে, তাদের কাছেও তেল নেই। তিন হাজার লিটার তেল লাগবে। না হয় যেতে পারবেন না। কারণ, এখান থেকে জ্বালানি না নিয়ে গেলে পথে অন্য কোথাও জ্বালানি নেওয়ার সুযোগ নেই। পথে আটকে থাকতে হবে।

‘কালোবাজারি করছে কারা?’

মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর ঘাটে মঙ্গলবার চারটি লাইটার জাহাজকে জ্বালানির জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। জাহাজগুলোর কর্মচারীরা জানান, এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁরা। এই জাহাজগুলো ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকলে পণ্য পরিবহন করে।

জাহাজগুলোর মালিক মেসার্স রাজিব শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিক্স। কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. রাজিব হোসেন জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কিছুদিন পরও তিনি ১০০ টাকা লিটারে তেল নিয়েছেন। কিন্তু মার্চের শেষের দিক থেকে তেলের সংকট তীব্র হয়েছে।

রাজিব হোসেন অভিযোগ করে প্রথম আলোকে, সংকটকে পুঁজি করে একটি শ্রেণি কালোবাজারি করছে। তারা ন্যায্যমূল্যের চেয়ে লিটারপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দাবি করছে। জাহাজের মাস্টার ও অন্য কর্মচারীদের কাছে বাড়তি দামে তেল বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে।

তেল না পেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ভাসমান পাম্পগুলো। ডিপো থেকে তেল এনে সেই তেল বিভিন্ন জাহাজে সরবরাহ করে এই পাম্পগুলো। মঙ্গলবার মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে

মঙ্গলবার দুপুরে মুঠোফোনে রাজিব প্রথম আলোকে বলেন, কালোবাজারিতে যদি বাড়তি দামে তেল পাওয়া যায়, তার মানে দেশে তেল আছে। প্রশ্ন হলো কালোবাজারি করছে কারা? তারা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে?

মেসার্স রাজিব শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিক্সের অধীনে বর্তমানে ১০টি লাইটার জাহাজ চলছে। এই জাহাজগুলো ভারত থেকে চাল, গম, ভুট্টা, ইস্পাত, তুলাসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানির সঙ্গে যুক্ত। দেশের বিভিন্ন বন্দর থেকেও জাহাজগুলো পণ্য সরবরাহের কাজ করে।

জ্বালানি পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণহীন উল্লেখ করে রাজিব হোসেন আরও বলেন, ‘যে পরিস্থিতি দেখছি, আমাদের ব্যবসা টেকানো দায় হবে। বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করি। আমার মতো আরও অনেকে ভুক্তভোগী। এমনটা চললে বিভিন্ন পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হবে। কিছুদিনের মধ্যেই অর্থনীতির ওপর খুব বাজেভাবে এর প্রভাব পড়বে।’

মেঘনা নদীতে লাইটার জাহাজ। গত মঙ্গলবার মুন্সিগঞ্জে

অলস দাঁড়িয়ে ফ্লোটিং পাম্প

নৌপথে চলাচল করা মাঝারি ও ছোট বিভিন্ন কোস্টার, লাইটার, বাল্কহেড এবং ট্রলারে জ্বালানি (ডিজেল) সরবরাহ করে বিভিন্ন ফ্লোটিং (ভাসমান) পাম্প।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মেঘনা ঘাটে এমন ১৫টি ফ্লোটিং পাম্প তেল সরবরাহের কাজে যুক্ত আছে। মঙ্গলবার দুপুরে ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে ভেড়ানো ওটি সুমন, ওটি ডেল্টা, ওটি আল মোবারক, ওটি সুমন-১, ওটি স্বপ্নীলসহ বিভিন্ন নামের ১৩টি ফ্লোটিং পাম্প। তেল সরবরাহের কাজে নদীতে আছে দুটি ফ্লোটিং পাম্প।

এই ফ্লোটিং পাম্পগুলো মাসে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার লিটার তেল সরবরাহ করে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেশির ভাগ সময় এভাবে অলস দাঁড়িয়ে থাকছে সেগুলো। তেল সরবরাহ কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ।

মেসার্স শামীম ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, স্বাভাবিক সময়ে তাঁদের পাম্প মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার লিটার পর্যন্ত তেল সরবরাহ করত। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর এক মাসে মাত্র ৬০ হাজার লিটার তেল সরবরাহ করতে পেরেছেন।

এমভি টিকলি কার্গো জাহাজের মাস্টার আজমল শেখ। ৩১ মার্চ থেকে তেলসংকটে অপেক্ষায় আছেন মেঘনা ঘাটের পাশে। আবার তেল পেলে জাহাজ নিয়ে ভারতের কলকাতা বন্দরে যাবেন। গত মঙ্গলবার মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে

শামীম ট্রেডার্স নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ডিপো থেকে তেল এনে বিভিন্ন জাহাজে সরবরাহ করে। শামীম ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিপো থেকে তেল দেয় না। তাই আমরাও কাউকে দিতে পারছি না। দুই-তিন দিন ঘুরে এক দিন তেল পাই। তা-ও চাহিদার চেয়ে অনেক কম। আগে চাহিদা অনুযায়ী যখন চেয়েছি, তখনই তেল পেয়েছি। কিন্তু এখন কয়েক দিন ঘুরেও তেল পাচ্ছি না।’

আবদুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, ‘বেশি দামে তেল কিনতে আগ্রহী। তবু কেউ তেল দিচ্ছে না। আমরা সরবরাহ করতে না পারায় জাহাজগুলো দাঁড়িয়ে আছে। তারাও এখন বিপদে।’

একই রকম সংকটের কথা জানান ওটি স্বপ্নীল ফ্লোটিং পাম্পের ইনচার্জ রিয়াজ সরদার। তিনি জানান, তাঁদের পাম্প বিভিন্ন কোস্টার, লাইটার, বাল্কহেড এবং ট্রলারে প্রতি মাসে ১ লাখ লিটার তেল (ডিজেল) সরবরাহ করে। তবে সর্বশেষ তাঁদের ফ্লোটিং পাম্প তেল পেয়েছে গত ১৬ মার্চ। এর পর থেকে আর তেল সরবরাহ করতে পারেননি।

রিয়াজ সরদার মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিন টানা বসে আছি। কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। কত দিন এভাবে চলবে, বলতে পারছি না।’