বরগুনাসহ দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে চলতি বছরও বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ ভাগ কম বৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধারাবাহিক অনাবৃষ্টি এখন দক্ষিণাঞ্চলের নতুন এক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনাবৃষ্টির কারণে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে লবণাক্ততা। ফলে এ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০১৩ সালে বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু-সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে দাবদাহের পরিমাণ বেড়ে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে আসবে। আবার অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টি হবে। অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ উচ্চ দুর্যোগ-ঝুঁকির মধ্যে বাস করছেন। ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে এক কোটি ৩৫ লাখে দাঁড়াতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বর্ষা মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে প্রায় ২০ ভাগ কম। গত বছর ২২ ভাগ কম ছিল। এবার বর্ষা মৌসুম বাদে অন্য সময়গুলোয়ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়েছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে উপকূলে বৃষ্টিপাতের এই তারতম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
২০১৩ সালে করা বরিশাল মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বরিশাল বিভাগে ১১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৩০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে তিন লাখ ৮৬ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমি অতিলবণাক্ত। এসব জমিতে লবণের পরিমাণ সময়বিশেষে ১৬ থেকে ২৮ দশমিক ৫ ডেসিসিমেন পার মিটার (ডিএস/এম)। ধানগাছের লবণ সহনশীলতার সর্বোচ্চ মাত্রা চার থেকে আট ডিএস/এম। এ ছাড়া সবজির লবণ সহনশীলতা মাত্র দুই থেকে চার ডিএস/এম।
ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল অঞ্চলে লবণাক্ততার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বরগুনা। এ জেলার এক লাখ ৬৭ হাজার ৬৮০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৯৫ হাজার ৬২০ হেক্টর জমি লবণাক্ত। এর পরের অবস্থানে রয়েছে পটুয়াখালী। এ জেলার তিন লাখ সাত হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমির মধ্যে এক লাখ ৫৫ হাজার ১৮০ হেক্টর জমি লবণাক্ত। এরপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরিশাল।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অতিমাত্রার লবণাক্ততার কারণে (১৬ ডিএস/এমের ওপরে) গত পাঁচ বছরে বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা ও ঝালকাঠি—এই চার জেলার ৬৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি ফসল চাষের অনুপযোগী হয়ে গেছে।
অনাবৃষ্টি ক্রমান্বয়ে লবণাক্ততা বাড়ার প্রধান কারণ বলে মনে করেন মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা লিয়াকত হোসেন জানান, খরা ও অধিক তাপমাত্রায় মাটি ও পানিতে লবণের মাত্রা বেড়ে যায়। সাধারণত প্রতি লিটার পানিতে লবণের হার চার থেকে আট ডেসিসিমেন পর্যন্ত থাকলে ধান চাষ করা সম্ভব। কিন্তু বরিশাল অঞ্চলে অনেক স্থানেই লবণের ভাগ ১৫ থেকে ২৮ ডেসিসিমেন পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
তবে কৃষি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, লবণাক্ততার মাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠলেও এখন পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়নি। জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে হাতে নেওয়া সরকারের সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের (আইএসএমসি) বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের কৃষি বিশেষজ্ঞ মো. শহিদুল্লাহ জানান, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা ভয়ানক হারে বাড়ছে। এতে কৃষি উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার কথা থাকলেও ব্যাপক হারে উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষ করে তা সামাল দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য এখন পর্যন্ত উৎপাদনে প্রভাব পড়েনি। কিন্তু এ অঞ্চলের প্রধান ফসল আমনের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আইএসএমসি প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের ১১ জেলার ৬৬টি উপজেলার কৃষকদের মাঠপর্যায়ে লবণসহিষ্ণু ধান আবাদ, জাত নির্বাচন এবং পরিচর্যার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে লবণাক্ততা যে হারে বাড়ছে, তাতে এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে।
জানতে চাইলে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিন আ ক ম মোস্তফা জামান জানান, বৃষ্টি কমে যাওয়ায় দাবদাহ বাড়ছে। এটা এখন আর উপেক্ষার পর্যায়ে নেই। অনাবৃষ্টি রীতিমতো নতুন দুর্যোগ। ফলে পুরো উপকূলজুড়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাবে। খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকিতে ঠেলে দেবে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও লবণাক্ততা গ্রাস করে নেবে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।