শীতের পাখি

পরিযায়ী পিয়ং হাঁস

রাজশাহীর পদ্মার চর মাজারদিয়ারের কাছে উড়ন্ত এক জোড়া পিয়ং হাঁস l ছবি: মো. মারুফ রানা
রাজশাহীর পদ্মার চর মাজারদিয়ারের কাছে উড়ন্ত এক জোড়া পিয়ং হাঁস l ছবি: মো. মারুফ রানা

সাত-আট বছর আগে শীতকালে ঢাকা চিড়িয়াখানার লেকজুড়ে নানা প্রজাতির পরিযায়ী হাঁসের মেলা বসত। কিন্তু দিনে দিনে এদের প্রজাতি ও সংখ্যা কমে বর্তমানে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ২০১০ সালে চিড়িয়াখানার লেকে মাত্র এক প্রজাতির ৩৪টি হাঁসের দেখা পাই। ২০১১ সালে ওখানে একই প্রজাতির ১৮টির দেখা পেয়েছিলাম। এরপর চিড়িয়াখানার লেকে কোনো পরিযায়ী হাঁসের দেখা পাইনি। গত কয়েক বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের লেকেও ছোট সরালি (Lesser Whistling Duck) ছাড়া আর কোনো প্রজাতির হাঁস চোখে পড়েনি। তবে, ওই প্রজাতির পরিযায়ী হাঁস বাইক্কা বিল, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়া হাওর এবং উপকূলীয় এলাকায় কয়েক বছর ধরে নিয়মিত দেখছি। দেখা পেয়েছি রাজশাহীর পদ্মার চরেও।

এরা হলো পিয়ং হাঁস। ইংরেজি নাম Gadwall। Anatidae পরিবারভুক্ত এই হাঁসের বৈজ্ঞানিক নাম anus strepera.

পিয়ং মাঝারি আকারের হাঁস। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪১ সেন্টিমিটার ও ওজনে প্রায় ৭৪০ গ্রাম। হাঁসা ও হাঁসির পালকের রঙে ভিন্নতা রয়েছে। হাঁসার দেহে ধূসর, কালো ও বাদামির প্রাধান্য দেখা যায়। মাথা বেশ বড় ও চৌকোনা। প্রজননকালে হাঁসার পিঠ হয় ধূসর বাদামি। বুকে দেখা যায় গোল গোল নকশা। ঠোঁট ধূসর, পেট সাদা, লেজ ও লেজের তলা কালো। হাঁসির দেহের পালকের রং হাঁসা থেকেও বেশি বাদামি, অনেকটা যেন নীলশিরের (Mallard) হাঁসির মতো। ঠোঁটের দুপাশ কমলা। হাঁসা-হাঁসি উভয়েরই চোখ কালচে; পা ও পায়ের পাতা বাদামি হলুদ। প্রজননকাল ছাড়া অন্য সময় হাঁসার পিঠ কালচে। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক হাঁসার বুকের কমলা রং ছাড়া বাদবাকি সবকিছু হাঁসির মতো।

পিয়ং হাঁস সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি। মূলত উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও সাইবেরিয়ার আবাসিক পাখি। স্বাদু ও লবণাক্ত পানির জলাভূমি, অগভীর হ্রদ, পুকুর, নদী ও মোহনায় বিচরণ করে। শীতে বাংলাদেশের হাওর, হ্রদ, নদী ও উপকূলীয় এলাকায় দেখা যায়। সাধারণত হাঁসের মিশ্র ঝাঁকে থাকে। জলজ উদ্ভিদের পাতা ও কাণ্ড, মূল, বিচি, কীটপতঙ্গ, শামুক-ঝিনুক-গুগলি, ব্যাঙ ইত্যাদি খায়। তবে প্রজননের আগে হাঁসি আমিষসমৃদ্ধ খাবার বেশি খায়।

মে-জুলাই প্রজননকাল। এ সময় জলাশয় বা অগভীর হ্রদের আশপাশের তৃণভূমি বা ঝোপঝাড়ে শুকনো ঘাস, পাতা ও ঝরা পালক দিয়ে বাসা বানায়। হাঁসি হালকা পীতাভ রঙের ৭-১২টি ডিম পাড়ে, যা ২৪-২৭ দিনে ফোটে। ডিমে হাঁসিই বেশির ভাগ সময় তা দেয়। বাচ্চারা ৪৯-৭০ দিনে উড়তে শেখে ও গড়ে এক বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়।