বিশ্লেষণ

প্যারিস চুক্তিতে সব আছে, কিছু নেই

.

বিশ্বের ১৯৫টি দেশ প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুমোদন করেছে। এই চুক্তিতে কী আছে, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু বিপন্ন দেশ এই চুক্তি থেকে কী পেল—এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ও জলবায়ুবিজ্ঞানী বিজর্ন লুমবুর্গ চুক্তিটি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এই চুক্তি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ১ শতাংশ সমাধান করতে পেরেছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই চুক্তি বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারবে।
লুমবুর্গের ওই বিশ্লেষণের সঙ্গে কেউ একমত বা দ্বিমত হতে পারেন। তবে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন, এমন বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ প্যারিস চুক্তিকে আশার ফুলঝুরি হিসেবেই দেখছেন। তাঁরা বলছেন, চুক্তিতে সব দেশের দাবি কোনো না কোনোভাবে আছে। কিন্তু কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অর্থ দেওয়ার প্রধান দাবি বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা চুক্তিতে নেই। তবে অনেকে একে ‘নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ বলে মনে করছেন।
পাঁচ বছর আগে কোপেনহেগেনে অনেক আশা জাগিয়ে চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত প্যারিসে বিশ্বের সব দেশের সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তি হওয়াটাও বড় অর্জন। এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রির বেশি বাড়তে না দেওয়ার কথা চুক্তিতে উল্লেখ থাকায় এই প্রথমবার সব দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা পেল। এখন সে পথ ধরেই বিশ্ববাসীকে এগিয়ে যেতে হবে।
প্যারিস চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানও যে খুব বেশি আশাবাদী ধরনের, তা-ও কিন্তু নয়। গতকাল মঙ্গলবার পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, বিশ্বের প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী ৫৫টি দেশ তাদের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কতটুকু কমাবে, তার ওপর নির্ভর করবে চুক্তির ভবিষ্যৎ। তারা প্যারিস চুক্তিটি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে গিয়ে স্বাক্ষর করবে। তাদের নিজ নিজ দেশের সংসদে অনুস্বাক্ষর করলে পরেই চুক্তিটি সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন শুরু হবে।
প্যারিস চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে লুমবুর্গ বলেন, এই চুক্তি সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হলে তা হবে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল চুক্তি। কেননা, এই চুক্তির আওতায় বিশ্বের ১৯৫টি দেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে অঙ্গীকার করেছে, জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রগুলোর খরচ অনেক বাড়িয়ে দেবে। এর পরিমাণ হতে পারে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে অনেক দেশেরই বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) কমে যাবে। কিন্তু জলবায়ু তহবিল হিসেবে ২০২০ সাল থেকে এক কোটি ডলারের যে তহবিলের কথা বলা হয়েছে, তা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একদমই অপ্রতুল।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সবুজ তহবিল (জিসিএফ) তদারকি-বিষয়ক স্বাধীন কারিগরি পরামর্শক প্যানেলের সদস্য আহসানউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্যারিস চুক্তি একটি অন্তঃসারশূন্য চুক্তি। কেননা, আমরা যদি এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেও রাখতে চাই, তাহলে এই চুক্তি দিয়ে তা সম্ভব না। কেননা, চুক্তিতে রাষ্ট্রগুলো স্বপ্রণোদিতভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে, তা যদি শতভাগ বাস্তবায়নও হয়, তাহলেও বিশ্বের তাপমাত্রা এই শতাব্দীর মধ্যে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়বে।’
আহসানউদ্দিন বলেন, ১৯৯৭ সালে জাপানে সই হওয়া কিয়োটো প্রটোকল চুক্তিতে শিল্পোন্নত ৩৭টি দেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর আইনি বাধ্যবাধকতাসহ চুক্তি করেছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে তাদের মোট বার্ষিক আয়ের দশমিক ৭ শতাংশ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। ওই অঙ্গীকার পূরণ না হলে জরিমানার বিধানও ছিল। কিন্তু কোনো দেশই তা বাস্তবায়ন করেনি। আর প্যারিস চুক্তিতে রাষ্ট্রগুলো অঙ্গীকার অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণ না কমালে জাতিসংঘের বা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কিছু বলার আইনি অধিকারও নেই। ফলে এটি সব অর্থেই একটি বাগাড়ম্বরপূর্ণ চুক্তি।
আহসানউদ্দিন আহমেদের মতে, চুক্তিতে জলবায়ুর ক্ষয়ক্ষতি (লস অ্যান্ড ডেমেজ) অংশে প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো সুকৌশলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি থেকে দায়মুক্তি নিয়েছে। কোনো দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে অন্য কোনো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায়িত্ব বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো পালন করবে বলে চুক্তিতে বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিমা কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত দেশ থেকে উল্টো আরও বেশি অর্থ নিয়ে যাবে। ফলে এটি আসলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আরও আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে।
চুক্তিতে জলবায়ু অভিযোজন অংশটি সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট ও সুন্দরভাবে লেখা। এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আহসানউদ্দিন বলেন, দেখে মনে হচ্ছে, চুক্তিটি যাঁরা লিখেছেন, তাঁরা এই অংশে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। কেননা, এই অংশেই বলা হয়েছে, কীভাবে জলবায়ু বিপন্ন দেশগুলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করবে।
তবে স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোট এলডিসির পরামর্শক ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষক সালিমুল হকের মতে, প্যারিস চুক্তি একটি সফল চুক্তি। কেননা, এ চুক্তির মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখার একটি লক্ষ্যমাত্রা পেল। বিশ্বের ২০০ দেশের এই লক্ষ্যে একমত হয়ে চুক্তিতে আসা সহজ কথা নয়। এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের দাবি বাংলাদেশ থেকেই প্রথম কোপেনহেগেনে তোলা হয়েছিল। ফলে সামনের দিনগুলোতে চুক্তি বাস্তবায়নের বিভিন্ন পদক্ষেপে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (বিসিএএস) নির্বাহী পরিচালক ও জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) সাবেক সদস্য আতিক রহমানের মতে, প্যারিস চুক্তিতে বিশ্বের যে দেশ থেকে যে ধরনের দাবি তোলা হয়েছে, সবকিছুই রাখা হয়েছে। কোনো দেশ যাতে নাখোশ না হয়, সে বিষয়টিতে খেয়াল করতে গিয়ে প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী রাষ্ট্রগুলোর কী পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ কমানো উচিত এবং তারা কতটুকু কমানোর অঙ্গীকার করল, তা বিবেচনা করা হয়নি।
তবে আতিক রহমানের মতে, সাধারণত বৈশ্বিক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে হয় প্রভাবশালী দেশগুলোর পক্ষে থাকতে হয়, নতুবা কোনো চুক্তিই হয় না। প্যারিস চুক্তি সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কেননা, এর মাধ্যমে শিল্পোন্নত ও স্বল্পোন্নত—দুই ধরনের দেশই তাদের অবস্থান থেকে ছাড় দিয়ে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রির নিচে রাখার ব্যাপারে একমত হয়েছে। তবে এই তাপমাত্রা কীভাবে ২ ডিগ্রির নিচে থাকবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা ছাড়াই তা হয়েছে।