
রাত ১২টা। বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকায় কেউ নেই। ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা ফিরে গেছেন হোটেল কক্ষে। সৈকতজুড়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল। ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে রাত ১০টার দিকে হালকা বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো হাওয়া বইলেও এখন অনেকটা শান্ত। তবে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল রয়েছে। গভীর রাতে ঝোড়ো হাওয়াসহ ভারী বৃষ্টিপাত নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। এই আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বসে নেই। তাঁরা উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে লোকজনকে সচেতন করছেন। নিয়ে গেছেন একাধিক গাড়ি। জলোচ্ছ্বাস হলে লোকজনকে গাড়িতে করে শহরের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হবে।
এদিকে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ঘূর্ণিঝড় ফণীর সার্বিক বিষয় নিয়ে ব্রিফিং করেন। তিনি বলেন, রাত পর্যন্ত কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, টেকনাফসহ বিভিন্ন উপকূলের শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে ৫৬ হাজারের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনকে সরিয়ে আনা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যেকোনো মুহূর্তে উপকূলের ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য লোকজনকেও সরিয়ে আনা হবে। এ জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি উদ্ধার দল মাঠে রয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ওখানকার মানুষ সহজেই আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে চায় না। বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকজনকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পুলিশের সহায়তায় জোর করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন। এ ছাড়া সাগর থেকেও জেলেদের কূলে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে ৫৬ হাজার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরের মধ্যে অবস্থিত প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চারপাশে প্রতিরক্ষা বেড়িবাঁধ নেই। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে সেখানকার কয়েকটি ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। ঝড়বৃষ্টির চাপ বেড়ে গেলে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ইউনিয়নের ১০ হাজার বাসিন্দার জন্য রয়েছে একটিমাত্র সাইক্লোন শেল্টার। আছে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একাধিক বহুতল ভবনের হোটেল। সেখানে লোকজনকে সরিয়ে আসতে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু তেমন সাড়া মিলছে না। রাতে হালকা বৃষ্টিপাত হলেও ঝোড়ো হাওয়া তেমন নেই। তবে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল রয়েছে। এতে মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
অমাবস্যার জোয়ারের প্রভাবে সমুদ্রের পানি পাঁচ-ছয় ফুট উচ্চতায় বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলে আঁচড়ে পড়ছে। কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবর ডেইল, কৈয়ারবিল, উত্তরধুরুং, লেমশিখালী ও বড়ঘোপ ইউনিয়নের ২২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ সময় গ্রামের কয়েক শ পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হয়েছে।
মহেশখালীর মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নেও ৯টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে। জোয়ারের চাপ বৃদ্ধি পেলে নতুন করে আরও কিছু গ্রাম প্লাবিত হতে পারে।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সকাল পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১৫টি দল ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অন্তত ১০ হাজার কর্মী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব শুরু হলেও অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে আসতে চায় না। তাই শহরের আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১৫টি দল গঠন করা হয়েছে। এসব দলে রেড ক্রিসেন্টের কর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক দলের কর্মী ও অন্য স্বেচ্ছাসেবকেরা রয়েছেন। তাঁরা সব সময় পরিবহনসহ প্রস্তুত। প্রয়োজন দেখা দিলেই এসব এলাকায় এলাকায় গিয়ে লোকজনকে প্রয়োজনে জোর করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসবেন। ঠিক একইভাবে উপজেলা পর্যায়েও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনারেরা (ভূমি) নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনতে কাজ করছেন। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আমরা প্রস্তুত। জানমালের ক্ষতি ঠেকানোর চেষ্টা অব্যাহত আছে।
রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক। তাই কোনো রোহিঙ্গাকে এখনো সরানো হয়নি। শিবিরে ক্যাম্প ইনচার্জদের জন্য নির্মিত কার্যালয়, ক্যাম্পের মসজিদ ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন দেখা দিলেই ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গাদের সেখানে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে। ক্যাম্পে স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ও এনজিও সংস্থাগুলো সজাগ রয়েছে।
এদিকে রাত সাড়ে আটটায় কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়া ও কুতুবদিয়াপাড়া উপকূল পরিদর্শন করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসারের নেতৃত্বে একটি দল। এই এলাকা সাগরের সঙ্গে লাগোয়া। ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় এলাকাটি। শুক্রবার রাত ১১টায় দেখা যায়, ইতিমধ্যে পানি বেড়ে যাওয়ায় সমিতিপাড়ায় নাজিরারটেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। লোকজন নৌকা নিয়ে যাতায়াত করছে। অনেকে নাজিরারটেক এলাকা থেকে নৌকা নিয়ে সমিতিপাড়ায় এসে আশ্রয় নিচ্ছেন।
নাজিরারটেক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সন্ধ্যা থেকে পানি বাড়তে শুরু করেছে। পানি বেড়ে যাওয়ার রাস্তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা নৌকা নিয়ে চলাচল করছি।’
জেলা প্রশাসনের এই দল পুরো এলাকায় মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। পরিস্থিতি খারাপ হলে প্রশাসনের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য সচেতন করেন সবাইকে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার প্রথম আলোকে বলেন, যানবাহন, সব যন্ত্রপাতিসহ প্রশাসনের টিম প্রস্তুত রয়েছে। টিমগুলো সারা রাত জেগে থাকবে। যখনই প্রয়োজন হবে, জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনা হবে। জনগণের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রও প্রস্তুত আছে।
রাতে সমিতিপাড়া ও কুতুবদিয়াপাড়া উপকূল পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, শাহজাহান আলী ও এসএম সরওয়ার কামাল, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কক্সবাজার ইউনিটের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল আবছার, মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ জয় প্রমুখ।