ডাক দিয়েছে হৈমন্তী ফল 

পানিফলের রং লাল, নীলাভ সবুজ বা কালচে সবুজ। সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সখীপুর এলাকা থেকে তোলা
ছবি: সংগৃহীত

সড়কের পাশে বা কোনো বাজারের ফলপট্টির ঝাঁ–চকচকে দোকানগুলোতে সাধারণত এ ফলের জায়গা হয় না। সেখানে থাকে ‘খুবসুরত’ দামি দামি দেশি-বিদেশি ফল। ফলটি বিক্রি হয় টুকরিতে, কিছুটা অনাদরের সঙ্গে, অল্প পুঁজির কোনো কারবারির হাতে। ফলটা দেখতে যেন কেমন!

রাজধানীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ফলটির যথেষ্ট উপস্থিতি। তবু যেন আমরা দেখেও দেখি না। নাম পানিফল। হেমন্তের প্রকৃতি যতই সুন্দর হোক না কেন, এ ঋতুতে ফুলও কিছু ফোটে বটে, তবে ফলের বেলায় হেমন্ত একেবারেই কৃপণ। আমাদের প্রকৃতিতে গ্রীষ্মকালই ফলের ঋতু।

হেমন্ত ঋতুর দেশি ফলের নাম যদি বলি, তবে পানিফলের নাম আসবে সবার আগে। পানিতে জন্মে বলেই এমন নাম। দেখতে অনেকটা শিঙাড়ার মতো। তাই সাতক্ষীরাসহ অনেক স্থানে এটি পরিচিত শিঙাড়া ফল নামে। ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, পানিফল দেখতে হুবহু মহিষের মাথার ছোট সংস্করণ। দুই পাশে শিঙের মতো দুটি কাঁটা, ফলের ওপর চোখ–নাক–মুখের অবয়ব অত্যন্ত স্পষ্ট। ফলের রং লাল, নীলাভ সবুজ বা কালচে সবুজ। পুরু নরম খোসা ছাড়ালেই পাওয়া যায় হৃৎপিণ্ডাকার নরম সাদা শাঁস। কাঁচা ফলের নরম শাঁস খেতে বেশ মজা। রসাল ও মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ।

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সখিপুরে খেত থেকে পানি ফল তুলছেন নারীরা। সম্প্রতি তোলা।

গাছের শিকড় থাকে কাদার মধ্যে, কাণ্ড থাকে পানিতে ডুবে; পাতা, ফুল ও ফল ভাসে পানির ওপরে। পাতা অনেকটা কচুরিপানার পাতার মতো দেখতে, তবে ছোট ও পুরু, গাঢ় সবুজ। পানিফলের চারটি পাপড়ির ছোট ছোট ফুল দেখতে অপূর্ব।

এ সময় ঢাকার হাটবাজার ও অলিগলিতে তাকালে পানিফল বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। দামেও বেশ সস্তা, ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজি। ফলটি সাধারণের কাছে তত পরিচিত নয়। তবে কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, ফলটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যথেষ্ট। এরই মধ্যে সাতক্ষীরা, নওগাঁসহ অনেক স্থানে নিচু জমিতে পানিফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা। পুষ্টিতে ভরপুর পানিফলের রয়েছে ঔষধি গুণও। এসব কারণে কৃষি বিভাগ পানিফলকে বলছে দেশি ফলের নতুন ‘সেনসেশন’।

পানিফলের পর হেমন্ত ঋতুর অন্য ফলগুলোর দিকে তাকানো যাক। কমলালেবু অবশ্য বইপত্রের তথ্য অনুযায়ী শীতের। তবে বেশ আগেই এসে গেছে হেমন্তের হাটবাজারে। একসময় দেশে চাহিদার বেশির ভাগ কমলা আমদানি হয়ে আসত। দেশি বলতে ছিল সিলেট-মৌলভীবাজারের কমলা। এখন সময় বদলেছে। পাহাড়ে বিস্তীর্ণ জমিতে কমলার চাষ হচ্ছে। রাঙামাটি থেকে প্রথম আলোর প্রতিনিধি সাধন বিকাশ জানান, পাহাড়ে কমলার গায়ে হলুদ রং এসে গেছে। আর সিলেটের কমলার প্রায় ৯০ ভাগের বিক্রি শেষ। গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন কমলার চাষ হচ্ছে। দেশি কমলায় মিষ্টতা বাড়ছে দিন দিন।

দেশি ফলের মধ্যে হেমন্ত ঋতুতে বাজারে আরও পাওয়া যাচ্ছে টক ফল জলপাই। মিষ্টি জলপাইও আছে, তবে বাজারে তেমন দেখা মেলে না । আছে সফেদা। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে ফলটির যে পরিচিতি, অন্য এলাকার মানুষ যেন একপ্রকার অপরিচয়ের অন্ধকারে রয়েছেন।

জাম্বুরা বা বাতাবি লেবু এখন আর বাজারে তেমন নেই, তবে আছে ড্রাগন ফল। আকারে একটু বড়, কেজি ২০০ থেকে ২৬০ টাকা। বাজারে দেশি ফলের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পেয়ারা। থাই জাতের এ পেয়ারা গাজীপুরসহ সারা দেশে চাষ হচ্ছে। বর্ষাকালের পেয়ারা কিছুটা পানসে হয়, এ সময়ে ফলটি বেশ মিষ্টি।

কলা অবশ্য সারা বছরই পাওয়া যায়। তবে হেমন্তকাল চাঁপা কলার সময়। সঙ্গে আছে দেশি সাগর কলাও। শবরি কলা এখন একটু কম। বাজারে কোনো কোনো ফলের দোকানে এ ঋতুর অতিথি ফল আতা ও তরমুজের দেখাও মিলছে। পেঁপে কিছুটা কমে এসেছে। কিছুদিনের মধ্যে দেখা মিলবে বিচিত্র নাম ও আকারের বরই।

কৃষিবিদ ও লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায় বলছিলেন, সাধারণভাবে ফল বলতে যেন আমরা আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা ও বেদানাকেই বুঝি। নিজেরা যেমন এসব ফল বেশি কিনি, আবার আত্মীয়স্বজন বেড়াতে গেলেও এগুলোকেই প্রাধান্য দিই; কিন্তু এটা রীতিমতো ভুল চর্চা। আমাদের সব সময় ঋতুভিত্তিক দেশি ফল কেনা ও খাওয়া উচিত। কারণ, দেশি ফলের সঙ্গে রয়েছে আমাদের মাটির সম্পর্ক। দেশি ফল একদিকে যেমন আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ; তেমনি সৌন্দর্য, গুণে-মানে-পুষ্টিতেও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই।

মৃত্যুঞ্জয় রায়ের কথা, ‘আমাদের গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব—পানিফলের মতো দেশি ফলের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।’