সুন্দরবনের বেড়ির খাল পার হচ্ছে বাঘ। ছবিটি ৬ মে তোলা
সুন্দরবনের বেড়ির খাল পার হচ্ছে বাঘ। ছবিটি ৬ মে তোলা

বেড়ির খালে সাঁতারু বাঘ

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। সকালেও রোদ ছিল বেশ। এই সময় বৃষ্টিধোয়া সবুজের বিচ্ছুরণে সুন্দরবন আরও মনোরম হয়ে ধরা দেয়। দিগন্তজোড়া বনের ফাঁকে ফাঁকে গেওয়া-পশুরের গাভর্তি রক্তলাল কিংবা হলুদ পাতা সুন্দরবনকে রাঙিয়ে তোলে বাহারি রঙে। খালের পাড়জুড়ে ঊর্ধ্বমুখী গোলপাতার সারি জড়াজড়ি করে দোল খায় আর বাতাসে রিমঝিম সুর তোলে। বনের ভেতরের সুন্দরীর গভীর বনে বিচরণ করে বুনো প্রাণীর দল। এ সময় সুন্দরবন যেন জেগে ওঠে আড়মোড়া ভেঙে।

ফ্রান্স সরকারের অর্থায়নে আইইউসিএন পরিচালিত বন্য প্রাণী জরিপের কাজে সুন্দরবনে যাই ৫ মে। প্রথম দিন হারবাড়িয়া বনাঞ্চলে জরিপের কাজ শেষে বিকেলে তাম্বুলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পে পৌঁছে যাই। ক্যাম্পের আশপাশে ছোট স্তন্যপায়ীর উপস্থিতি মূল্যায়নের জন্য নানা ধরনের আবাসস্থলে ট্র্যাপ স্থাপন করি। ট্র্যাপে যেসব প্রাণী ধরা পড়ে, সকালে সেগুলোর মাপজোখ নিতে নিতে প্রায় ১০টা বেজে যায়। অতঃপর বেড়ির খাল ধরে ‘বুনো হাঁস’ জাহাজ যাত্রা শুরু করে। ধীরে ধীরে আকাশ ভারী হতে শুরু করে। একসময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামে।

তাম্বুলবুনিয়া বন অফিস থেকে সকালের জোয়ারে আমরা বেড়ির খাল ধরে এগিয়ে চলেছি। জাহাজের দোতলায় বসার রুমে গবেষণার নানা বিষয়ে হালকা ধাঁচের আলোচনা চলছে। আমাদের জাহাজ তাম্বুলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে রওনা হয়েছে ঘণ্টাখানেক আগে। খুলনার কালাবগির মৌয়াল জেনারুল ঢালী গলায় গামছা জড়িয়ে জাহাজের সামনের ডেকে বসে পান চিবুচ্ছিল। পাশেই ছিলেন আরও কয়েকজন স্থানীয় গবেষক। হঠাৎ জেনারুল ঢালীর, ‘ওই, বাঘ, বাঘ; ওই বাঘ যায়’ চিৎকারে আমরা পড়িমরি করে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম।

পৌনে ১২টার দিকে বেড়ির খালের প্রায় অর্ধেকটা অতিক্রম করি। খালটিতে বেশ কিছু বাঁক আছে, সেই সঙ্গে বেশ সরু, তাই জাহাজের গতি কম রাখতে হচ্ছিল। এ সময় হালকা বৃষ্টিতে চারপাশের পরিবেশ হয়ে ওঠে বেশ উপভোগ্য। দুই পাশের গভীর বন আর খালের দুই পাড়ের গোলপাতার সারি প্রতিটি মুহূর্তকে আরও আনন্দময় করে তোলে। ঠিক এমন সময় বাঘের উপস্থিতি আমাদের হকচকিয়ে দেয়। ক্যামেরা হাতের পাশেই ছিল। রুম থেকে দ্রুত বের হয়ে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখতে গিয়ে অন্ধকার ঠেকল। বাঘ তো দেখতে পাচ্ছি না। আসলে ক্যামেরার লেন্সে যে ক্যাপ লাগানো ছিল, সেটি খোলার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বাঘ বলে কথা! হঠাৎ বাঘের উপস্থিতিতে মানুষের মননে একটি তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ সময় স্বাভাবিক থাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের অবস্থাটাও তা–ই হলো। সুন্দরবনে এমন মুহূর্ত খুব বেশি আসে না।

সুন্দরবনে বাঘ দেখা গেলে সাধারণত ছবি তোলার ভালো সময় পাওয়া যায়। নদী-খালের পাড়ে বাঘের দেখা পেলে শুরুতে বাঘ তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তবে কাছাকাছি কিংবা বিরক্ত হলে বাঘ ধীরে ধীরে বনের গভীরে লুকিয়ে পড়ে। কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যায় বাঘ যখন সাঁতরে নদী-খাল পার হয়। এমন সময় বাঘ দ্রুত সাঁতার কেটে বনের গভীরে হারিয়ে যায়। অনেক সময় পাড়ে উঠে বাঘ যখন ফিরে তাকায়, তখন কিছুটা সময় পাওয়া যায়।

জেনারুলের চিৎকারে বেরিয়ে এসে যখন জাহাজের সামনে দাঁড়াই, ততক্ষণে বাঘটি খালের তিন ভাগের দুই ভাগ অতিক্রম করে ফেলেছে। জাহাজ থেকে প্রায় তিন শ মিটার সামনে দিয়ে বাঘটি খালের বাঁ দিক থেকে ডান পাড়ের দিকে সাঁতার কাটছে। শুধু মাথাটা পানির ওপর, শরীরের বাকি অংশ দেখা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে কালচে ডোরা দেখা যায়। কিছুক্ষণ পরপর আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখছে আর ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে চলছে। আধা মিনিটের মধ্যে বাঘটি গোলপাতার সারির মধ্য দিয়ে বনের গভীরে মিলিয়ে গেল। মুহূর্তটি স্বপ্নের মতো হলো। ছবি তোলার ঝোঁকে বাঘটি যেন ভালো করে দেখারও সুযোগ পেলাম না।

সুন্দরবনের বাঘ সাঁতারে বেশ পটু। অনায়াসে ছোট বড় নদী-খাল পার হয়। বেড়ির খালটি বেশ সরু, গড়পড়তা ৫০ থেকে ৬০ মিটার চওড়া হবে। সুন্দরবনের বাঘ প্রতিনিয়ত এমন খাল পার হয়ে থাকে। শিকারের খোঁজে কিংবা নিজের টেরিটোরি পাহারা দিতে গিয়ে সুন্দরবনের বাঘকে ভালো সাঁতারু হয়ে উঠতে হয়। শিকার ধরার কৌশল শেখানোর পাশাপাশি সুন্দরবনের কাদা-শুলো মাড়িয়ে কিংবা জোয়ার-ভাটার সুন্দরবনের নদী-খাল পারাপারে এক দক্ষ সাঁতারু হিসেবে গড়ে তোলে।

  • এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়