
এমন একটি কুরচি বন দেখা রীতিমতো সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমাদের বনবাদাড়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কুরচিগাছ দেখেছি বটে, কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো কুরচিগাছ আগে দেখিনি। টিলার একটি বড় অংশজুড়ে শুধুই কুরচিগাছ। তবে গাছগুলোর এমন করুণ দশা দেখে মনে হয়েছিল, না দেখাই বরং ভালো ছিল! কয়েক শ গাছ একেবারে গোড়া থেকে কেটে রাখা। আবার কাটা অংশ থেকে গজিয়েছে কিছু ডালপালা।
ফুটেছে ফুলও। মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে থাকার চেষ্টা। ক্ষুদ্র পরিসরে কুরচিগাছের এমন ঘনত্ব আর কোথাও দেখিনি। কেন গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে? স্থানীয়দের কাছে এর কোনো উত্তর খুঁজে পাইনি। এই টিলার অবস্থান সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নে। স্থানীয়ভাবে বারেকটিলা নামেই পরিচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে এই টিলা ঘিরে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। সংলগ্ন শিমুলবাগান, জাদুকাটা নদী এবং নদীর অপর পাড়ের ঐতিহাসিক লাউড়ার গড় অনেকের কাছেই অন্যতম ভ্রমণতীর্থ। প্রায় এক যুগ আগে যখন শিমুলবাগানটি দেখি, তখন গাছগুলো নিতান্তই শিশু। ভাবিনি একসময় এটাই হয়ে উঠবে দেশের একমাত্র সুদৃশ্য শিমুলবাগান। অথচ বাগানটি করা হয়েছিল অনেকটা শখের বশে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদের সন্ধানে প্রায় প্রতিবছরই টাঙ্গুয়ার হাওরে যাই। ফিরে আসি শিমুলবাগান আর বারেকটিলা হয়ে। প্রতিবছর নতুন কিছুর দেখা পাই। বছর দু-তিনেক আগের কথা। শিমুলবাগান দেখে ঢাল বেয়ে ওপরের দিকে উঠতেই চোখে পড়ে ফুটকি বেগুনের ঝাড়। ফুল দেখতে হুবহু বেগুনের ফুলের মতোই। পাতাও অনেকটা তেমন। তবে পার্থক্য শুধু ফলে। ফল একেবারেই ছোট। গাছটি স্থানীয়ভাবে বৃহতী, ব্যাকুড়, বায়াকুর, প্রসহা, বীরহাত্তা বা জুরকামাই নামে পরিচিত। ফুলভর্তি গাছ বেশ আকর্ষণীয়।
ফুটকি বেগুন (Solanum violaceum) তীক্ষ্ণœকাঁটাযুক্ত গুল্ম শ্রেণির গাছ, প্রায় দেড় মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। গাছের গায়ে ও পাতায় সামান্য বাঁকা ঘনবদ্ধ কাঁটা আছে। পাতা একান্তর সরল, রোমশ ও খণ্ডিত। ফুলের রং বেগুনি। ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ, গোলাকার, দেখতে মটরের মতো। প্রায় সারা বছরই ফুল ও ফল দেখা যায়।
টিলায় উঠে বিধ্বস্ত কুরচি বন দেখে মনটা খুবই বিষণ্নœহলো। বনে এ গাছ সংখ্যায় আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। নগর উদ্যানেও খুব একটা নেই। ঢাকায় বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি গাছ আছে। বলধা গার্ডেন, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, রমনা নার্সারি, কার্জন হল প্রাঙ্গণ, বাংলা একাডেমি, ধানমন্ডির কয়েকটি সড়ক এবং সদরঘাট রোডে অবস্থিত ন্যাশনাল হাসপাতালসহ আরও কয়েকটি স্থানে এ গাছ দেখা যায়। শুভ্রতা ও সুগন্ধিতে এই ফুল অনন্য। কুরচি ভেষজ মূল্যেও অনন্য।
টিলার ঠিক কতটা জুড়ে কুরচিগাছের বিস্তার, তা বোঝার চেষ্টায় অন্য প্রান্তে দৃষ্টি ফেরাই। তখনই বেগুনি রঙের মোহনীয় এক উৎসবে চোখ আটকে যায়। রংবাহারী এই ফুল বৃহত্তর সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের ঢালুতে অনেকবার দেখেছি। আছে শালবনেও। এ ছাড়া কক্সবাজারসহ দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতেও দেখা যায়। স্থানীয় নাম বোরমালা, খোজা বা মাকাঞ্চি। এমন সুদৃশ্য উদ্ভিদটি নগর-উদ্যানে একেবারেই অনুপস্থিত। আমাদের বনপাহাড়ে এ গাছের আরও কয়েকটি প্রজাতি চোখে পড়ে।
বোরমালা (Callicarpa tomentosa) মাঝারি আকৃতির গাছ, সাধারণত ৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। চিরহরিৎ এই গাছ অঞ্চলভেদে পত্রমোচীও হতে পারে। পাতা পুরু, সরল ও ঊর্ধ্বমুখী, বিপ্রতীপ, ঘনবদ্ধ সাদা ভেলভেটের মতো। রক্তবেগুনি রঙের ছোট আকৃতির অজস্র ফুল গুচ্ছবদ্ধভাবে থাকে। ফুলের মৌসুম দীর্ঘ। মে থেকে প্রায় ডিসেম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত।
কুরচি আর বোরমালার ছবি তুলে ঢাল বেয়ে জাদুকাটার তীরে এসে থামি। গোটা নীলাকাশ যেন নদীর বুকে নেমে এসেছে। শীতের উজ্জ্বল নরম রোদ নদী তরঙ্গে স্বপ্নের শিহরণ ছড়িয়ে রেখেছে। এই শিহরণ পরিযায়ী মনকে আরও ব্যাকুল করে। এসবের সঙ্গে ভালো লাগার মতো আছে নিস্তব্ধতা, নির্জনতা, প্রকৃতির সজীবতা আর অসংখ্য পাখির সংলাপ। স্থানীয়দের মতে, এই নদীর বালু উৎকৃষ্ট মানের। উজান থেকে ভেসে আসে পাথরও। এ কারণে বালু ও পাথর সংগ্রহের বিপুল এক কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। নদীর প্রকৃত সৌন্দর্য ওদের হাতেই জিম্মি হয়ে পড়েছে।
মাত্র ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট একটি জেলা সুনামগঞ্জ। তার চেয়েও অনেক ক্ষুদ্র তাহিরপুরের এই বারেকটিলা। কিন্তু তাতে বৈচিত্র্যের কোনো কমতি নেই। এসব বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক