ঝিনাইদহের শৈলকুপার উমেদপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িতে ফুটেছে লাল ট্যাবেবুইয়া
ঝিনাইদহের শৈলকুপার উমেদপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িতে ফুটেছে লাল ট্যাবেবুইয়া

দেশে নবীন দুই ফুল

এখানে একটি ফুলের রং সাদা, অন্যটি লাল বা ম্যাজেন্টা রঙের। এই দুটি ফুলের মধ্যে বিস্তর তফাত থাকলেও একটি বিষয়ে কিছুটা মিল আছে, তা হলো গড়নের দিক থেকে ফুল দুটি প্রায় অভিন্ন। লম্বা টিউবের মাথায় সুদৃশ্য পাপড়ি আছে। সাদা ফুলের চারটি পাপড়ি দেখতে তারার মতো। লালচে রঙের ফুলের কোমল ৫টি
পাপড়ি অনেকটা এলায়িত। এই ফুল দুটি আমাদের দেশে সচরাচর খুব একটা দেখা যায় না। সাদা ফুলটি প্রায় এক দশক আগে প্রথম দেখেছিলাম বৃক্ষমেলায়। পরে অবশ্য বিচ্ছিন্নভাবে দু–একটি বাগানেও দেখেছি।

লাল রঙের ফুলটি এসেছে আরও কয়েক বছর পর। আমাদের দেশে আবাদিত হওয়ায় ফুল দুটির বাংলা নাম নেই। লাল রঙের ফুলটি মূলত ট্যাবেবুইয়ারই রকমফের। ইংরেজি নাম ব্লাড-রেড ট্রাম্পেট ট্রি। লাল ট্যাবেবুইয়াও বলা যেতে পারে। সাদা ফুলটি মাদাগাস্কার জেসমিন বা মাদাগাস্কার জুঁই নামে পরিচিত। আমাদের দেশে অপেক্ষাকৃত নবীন এই ফুল দুটির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জানা যাক।

মাদাগাস্কার জুঁই

চিরসবুজ কাষ্ঠল লতার গাছ। প্রায় ৬ মিটার লম্বা হতে পারে। পাতা পুরু, চকচকে গাঢ় সবুজ, ৯ সেমি দীর্ঘ এবং ডিম্বাকৃতির। গুচ্ছবদ্ধ ফুলের রং ধবধবে সাদা, প্রায় ৩ সেমি লম্বা, মোমের মতো, তীব্র সুগন্ধযুক্ত এবং নলাকার। ফুল ফোটার সময়কাল বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত বিস্তৃত।

মাদাগাস্কারের মাঝারি তাপমাত্রার আবহাওয়া, অধিক আর্দ্রতা এবং গরম, ভেজা গ্রীষ্ম এবং শুষ্ক শীতের ঋতুচক্র এই ফুলের বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। পর্যাপ্ত আলো এবং পানির ব্যবস্থা থাকলে ট্রাম্পেট আকৃতির এই ফুলগুলো সব ঋতুতেই কমবেশি থাকে। যেসব এলাকায় বাইরে শীতের মাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, সেখানে গ্রিনহাউস বা গৃহস্থালির পরিবেশে শীতকালটা দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারে। গ্রীষ্মে বৃদ্ধির মৌসুমে, এই লতায় পূর্ণ রোদ, প্রচুর জল, উচ্চ আর্দ্রতা এবং সুষম সারের প্রয়োজন হয়। তাপমাত্রা ঠান্ডা হতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে পাত্রগুলো বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসা উচিত এবং সবচেয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানে স্থাপন করা উচিত। বাগানের জন্য আদর্শ শ্রেণির হওয়ায় এই উদ্ভিদ (Stephanotis floribunda) রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছে। সাধারণত কাটিং বা বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার। নতুন শাখা-প্রশাখায় ফুল ফোটার কারণে বৃদ্ধির মৌসুমে ছাঁটাই সর্বনিম্ন¤রাখা উচিত।

ভিক্টোরিয়ান সময়কালে এই ফুলকে বৈবাহিক সুখের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো। এ কারণে ডাচ ভাষায় ফুলটিকে ‘ব্রাইডাল ফ্লাওয়ার’ও বলা হয়। অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি সুসজ্জিত ফুলের ঝুড়ি থেকে এ ফুলের চমৎকার মিষ্টি সুবাস স্বাভাবিকভাবেই একটি মনোরম অনুভূতি যোগ করে। সাধারণত এই ফুলের মিষ্টি সুবাস কখনোই ভোলা যায় না এবং এটি একটি অসাধারণ দিনের স্মৃতি হিসেবে বেঁচে থাকে সুদীর্ঘকাল। 

মাদাগাস্কার জুঁইয়ের ছবি বৃক্ষমেলা থেকে তোলা

লাল ট্যাবেবুইয়া

গুল্ম বা ছোট গাছ ৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। রক্ত-লাল রঙের নলাকার এই ফুল সহজেই চেনা যায়। ছোট শাখায় গুচ্ছবদ্ধভাবে একাধিক ফুল ফোটে। ছোট গাছগুলোয় সাধারণত একটি কাণ্ড থাকে। পরিণত গাছগুলো প্রায়ই মাটির ঠিক ওপরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একাধিক কাণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বাকল ধূসর, মসৃণ ও সামান্য ফাটলযুক্ত। এ গাছে শাখা–প্রশাখা তুলনামূলকভাবে কম। ডালপালা হালকা ধূসর। ডালের আগায় ৩ থেকে ৫টি পুরু পাতা থাকে। ৩ থেকে ১৫ সেমি লম্বা কচিপাতা উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার, সম্পূর্ণ প্রান্তযুক্ত এবং ডগায় সূক্ষ্মভাবে বৃত্তাকার। পুষ্পমঞ্জরি একটি বহু-ফুলের প্রান্তিক শাখান্বিত মঞ্জরির সমষ্টি, প্রায়ই পাতাহীন শাখায় দেখা যায়। বসন্তের মাঝামাঝি থেকে গ্রীষ্মের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ফুল ফোটে।

ফল দেখতে ক্যাপসুলের মতো, ৬ থেকে ১১ সেমি লম্বা এবং এতে ১ দশমিক ৯ সেমি লম্বা ঝিল্লিময় দুই-ডানাযুক্ত বীজ থাকে। এই গাছ (Tabebuia haemantha) ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের পুয়ের্তোরিকো দ্বীপে স্থানীয়ভাবে জন্মে। পৃথিবীর উষ্ণমণ্ডলীয় অন্যান্য দেশে এই গাছ আবাদ করা হয়। এই গাছ ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের গাছবাড়ি এবং বান্দরবানের লামায় অবস্থিত কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে আছে। বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রোপণ করা যেতে পারে।