ফুল

৩০০ জাতের গোলাপবাগান

গোলাপবাগান, ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে
ছবি: লেখক

সিটি অব বেলফাস্ট থেকে সিটি অব ঢাকা। উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্ট থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার দূরত্ব ১২ হাজার ১৫৭ কিলোমিটার। এই দুইয়ের দেখা পেলাম মাত্র পাঁচ মিটারের ব্যবধানে। না, কোনো ছবি নয়, বাস্তবে। ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গোলাপবাগানে দেখা হলো এই দুই জাতের গোলাপের সঙ্গে। সিটি অব বেলফাস্ট গোলাপের রং কমলা–লাল আর সিটি অব ঢাকা জাতের রং গোলাপি। সিটি অব ঢাকার সুগন্ধ বেশি হলেও ফুলটা ছোট।

এ রকম শত শত গোলাপ ফুটে আছে সেই গোলাপবাগানে। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালক ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া বললেন, ‘প্রায় ৩০০ জাতের গোলাপ আছে এই বাগানে। জানামতে, এ দেশে আর কোনো গোলাপবাগানে এত জাত নেই। প্রায় পাঁচ দশক ধরে দেশ-বিদেশ থেকে এসব জাতের গোলাপ সংগ্রহ করে এখানে লাগানো হয়েছে।’

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ১ হাজার ১০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে গোলাপ এক প্রজাতির উদ্ভিদ। প্রায় ৪ দশমিক ১ একরের দুটি গোলাপবাগান রয়েছে এখানে, একটির আয়তন ৩ দশমিক শূন্য ৫ একর ও অন্যটির ১ দশমিক শূন্য ৫ একর। বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অফিসার সোহেলী সরকার বললেন, বর্তমানে দুটি বাগানে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার চারা তৈরি করে বিক্রি ও জাত সম্প্রসারণ করা হয়। যার ফলে এই উদ্যান থেকে দেশের বিভিন্ন গোলাপবাগানে বিভিন্ন জাতের গোলাপ ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক জাত মিরান্ডি ও তাজমহল গোলাপও রয়েছে।

অফিস ভবনের সামনে চারদিকে বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা বাগানটায় ঢুকতেই বৃত্তাকারে চারটি ছোট জলাশয় উদ্যান, যেখানে রয়েছে পৃথিবীর দুর্লভ আমাজান লিলির গাছ, এরপর পথের দুই ধারে রয়েছে দুটি আয়তাকার জলবাগান, যেখানে রয়েছে শাপলারা। এরপর গোলাপবাগানের তোরণ, তোরণের ওপর ঝাঁপিয়ে চলেছে কনকলতার গাছ। পথের দুই ধারে থরে থরে লাগানো রয়েছে শত শত গোলাপের গাছ।

কয়েকটি গোলাপগাছের জাতের নাম লেখা রয়েছে ফলকে, অধিকাংশ জাতেরই নাম লেখা নেই। অভিজ্ঞ মালি গিয়াসউদ্দিন সাহায্য করলেন প্রায় ৬০টি জাতের গোলাপ চিনতে। অবসরে গিয়েছেন তিনি, গোলাপবাগানের প্রায় প্রথম থেকেই তিনি রয়েছেন। তাই তাঁর মতো আর কেউ হয়তো এসব জাতের সাক্ষী নেই, চেনেনও না।

একে একে দেখা পেলাম বরফসাদা রঙের ফ্লোরিবানডা গোলাপ আইসবার্গ, মিশ্র রঙের তিমি, ফিউলিয়ার, মিশ্র গোলাপি লাল পারফেক্টা, দোরঙা পিগালি ও আসিরিয়া, একহারা গোলাপি পাপড়ির অ্যাঞ্জেলিনা, কমলা–গোলাপি বলের মতে ফুলের ড্রেক কোস্টার, লাল রঙের মার্গো, মিনিয়েচার হলুদ ও স্ট্রাইপ, কালো গোলাপ, বেগুনি গোলাপ, লাল রঙের বড় ফুলের মিরান্ডি, মিস্টার লিংকন, লাল সুগন্ধি ফুলের ক্রিমসন গ্লোরি, গাঢ় গোলাপি বড় ফুলের তাজমহল, গন্ধহীন হলুদাভ সাদা ভার্গো, লাল রঙের বড় ফুলের পাপা মিলান্ড, হলুদাভ–গোলাপি হালকা সুগন্ধের রাজা রামমোহন রায়, হলদে গোলাপি পিস অব ফায়ার, বিডিআর সাদা, সবুজ গোলাপ, কমলা রঙের সামার হলিডে, লাল রেখাযুক্ত টাটা সেন্টেনারি, মিষ্টি কমলা রঙের আঁটসাঁট ফুলের টোয়েন্টি ডেজ, হালকা হলুদ রঙের ম্যাডাম বাটারফ্লাই, দুধে আলতা রঙের জাস্ট জয় ইত্যাদি জাতের। এত রঙের গোলাপ দেখে গাইতে ইচ্ছা করছিল নজরুলসংগীতের দুটি কলি, ‘মনে সে শিরাজির নেশা লাগায়/ আঁখি-ইঙ্গিতে গোলাপ ফোটায়।’

বাগানে কাজ করছিলেন মালি ইয়াছিন। এতগুলো জাতের মধ্যে কোন জাতের গোলাপ তাঁর বেশি ভালো লাগে জানতে চাইলে ইয়াছিন বললেন, সব জাতের গোলাপই সুন্দর। একেক জাতের একেক রূপ, একেক সৌরভ। তবে তাঁর কাছে রঙে, রূপে, সৌরভে ডাবল ডিলাইট জাতটি সেরা বলে মনে হয়।

নজর রাখা দরকার, মূল্যবান এসব জাত যেন হারিয়ে না যায়।

  • মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক