সুস্থ করে তোলার পর অবমুক্ত করা হয়েছে শিকারিদের ফাঁদে আহত বাঘিনীকে। গতকাল সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে
সুস্থ করে তোলার পর অবমুক্ত করা হয়েছে শিকারিদের ফাঁদে আহত বাঘিনীকে। গতকাল সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে

দরজা খোলার পর খাঁচার ভেতরে এলিয়ে বসে পড়ে বাঘিনীটি, কীভাবে ফিরল বনে

ফাঁদে পড়া আহত বাঘিনীটি উদ্ধারের পর সুস্থ করে বনে অবমুক্ত। দেশের ইতিহাসে প্রথম সফল উদ্ধার ও অবমুক্তির ঘটনা এটি। 

রোববার দুপুর ১২টা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। এই বৃষ্টির মধ্যে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শ্যালা নদী ধরে এসে একটি লঞ্চ থামল। স্থানটি আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে। লঞ্চটি ঘিরে সবার আগ্রহ। কারণ, চলতি বছরের শুরুতে চোরা শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে আহত বাঘিনী সুস্থ হওয়ার পর সেটিকে সুন্দরবনে ফেরানোর প্রস্তুতি চলছিল এ লঞ্চ থেকে। 

লঞ্চে থাকা খাঁচাটির দৈর্ঘ্য পাঁচ ফুট, উচ্চতায় সাড়ে তিন ফুট আর প্রস্থে তিন ফুট। এর মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল বাঘিনীটি। খাঁচার দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর চারদিক তাকিয়ে খাঁচার ভেতরে শরীর এলিয়ে বসে পড়ে। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই যেন। বাঘিনীর ফিরে যাওয়ার মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করতে লঞ্চের দুই পাশে অবস্থান নেওয়া শতাধিক মানুষের অপেক্ষা বাড়তে থাকে।

বন বিভাগের কর্মীরা নানাভাবে চেষ্টার পরও বাঘিনীকে নড়ানো যাচ্ছিল না। অবশেষে এল সেই ক্ষণ। বেলা একটার দিকে খাঁচা থেকে ছোট্ট লাফ দিয়ে নেমে বনের ভেতরে ঢুকে পড়ে বাঘিনীটি। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন সবাই। একই সঙ্গে তৈরি হয় দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে বন বিভাগের প্রথম সফল উদ্ধার ও অবমুক্তির ঘটনা। এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরীসহ বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বন্য প্রাণী গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন। 

গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের পূর্ব অংশের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন বনে বাঘিনীটির ফাঁদে আটকে পড়ার খবর পায় বন বিভাগ। পরের দিন ট্রাঙ্কুইলাইজারগান ব্যবহার করে প্রাণীটিকে অচেতন করা হয়। পরে ফাঁদ কেটে লোহার খাঁচায় করে প্রাণীটিকে খুলনায় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়। বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঘিনীটির বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। 

বন বিভাগের কর্মীরা নানাভাবে চেষ্টার পরও বাঘিনীকে নড়ানো যাচ্ছিল না। অবশেষে এল সেই ক্ষণ। বেলা একটার দিকে খাঁচা থেকে ছোট্ট লাফ দিয়ে নেমে বনের ভেতরে ঢুকে পড়ে বাঘিনীটি। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন সবাই।

অবমুক্তির পর নিজ এলাকায় বিচরণ 

বেলা একটার দিকে অবমুক্তির তিন ঘণ্টা পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বনে প্রবেশ করে বাঘিনীটির চিকিৎসা ও করণীয় বিষয়ে গঠিত কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ এবং সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি দল। 

পরে এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাঘিনীকে বনে ছাড়ার পর আমরা তার পায়ের ছাপ ধরে বনে প্রায় ১৫০ মিটার হেঁটেছি। শুরুতে একটু দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও পায়ের ছাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে সে দ্রুত তার নিজের টেরিটরি (বিচরণ এলাকা) বুঝে নিচ্ছে।’ বাঘিনীটি দ্রুত তার এলাকার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে, এমন আশাবাদের কথা জানিয়ে এই অধ্যাপক আরও বলেন, যেহেতু এটা তার পুরোনো এলাকা, তাই কয়েক দিনের মধ্যে চিনে নেবে। 

বাঘিনীকে বনে ছাড়ার পর আমরা তার পায়ের ছাপ ধরে বনে প্রায় ১৫০ মিটার হেঁটেছি। শুরুতে একটু দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও পায়ের ছাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে সে দ্রুত তার নিজের টেরিটরি (বিচরণ এলাকা) বুঝে নিচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ

‘ক্ষতস্থান শুকানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ’ 

বাঘিনী উদ্ধারের সময় সামনের বাঁ পায়ে প্রায় তিন ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশিতে বারবার টানাটানির কারণে ক্ষতস্থানে পচন ধরেছিল। উদ্ধার করার সময় প্রাণীটি ছিল কঙ্কালসার।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাঘিনীটির বাঁ পা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যে আমরা খুবই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ সময় লেগেছিল এ কারণে। অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর ঘা শুকিয়ে আসছিল; কিন্তু শুকিয়ে এলে সে খুঁচিয়ে আবার সেখানে রক্তপাত ঘটাত। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের জন্য।’ বাঘিনীর আচরণ ও খাবার সম্পর্কে ধারণা পেতে বন্য প্রাণিবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হতো জানিয়ে রেজাউল করিম খুলনার ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারে বাঘিনীর যত্ন ও চিকিৎসায় অবদান রাখায় খুলনার বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান। 

কীভাবে বাঘিনীটির ক্ষতস্থান শুকিয়ে আসে, তার বিবরণে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ খুলনা কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে মধু প্রয়োগ করে ব্যান্ডেজ করলে মার্চের দিকে বাঘের পায়ের ক্ষত শুকাতে শুরু করে। এতে ক্ষতস্থানে মাংসপেশি চলে আসে। 

বন বিভাগ বলছে, শুরুতে বাঘিনীকে কলিজা খেতে দেওয়া হতো। তার স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে জীবন্ত প্রাণী দেওয়া শুরু হয়। জীবন্ত প্রাণী যেমন শূকর দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শিকার সাবাড় করার ক্ষিপ্রতা অর্জনের পর বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।

আধুনিক সরঞ্জামের ঘাটতি দূর করতে হবে

বন বিভাগ বলছে, শুরুতে বাঘিনীকে কলিজা খেতে দেওয়া হতো। তার স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে জীবন্ত প্রাণী দেওয়া শুরু হয়। জীবন্ত প্রাণী যেমন শূকর দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শিকার সাবাড় করার ক্ষিপ্রতা অর্জনের পর বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।

বন্য প্রাণী উদ্ধারে আমাদের আধুনিক যানবাহন ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। আমরা যে খাঁচায় বাঘ নিয়ে এসেছি, এটা ঠিক না। অবমুক্তি ম্যানুয়ালি না করে অটোমেটিক যানবাহন ব্যবহার করাটাই উত্তম। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে আমরা এ ধরনের সফলতার উদাহরণ আরও তৈরি করতে পারব
খুলনা বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী

এর ধারাবাহিকতায় গত শনিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে খুলনার ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারে বাঘিনীটিকে অচেতন করা হয়। এরপর তার জন্য বানানো খাঁচায় প্রবেশ করিয়ে চেতনা ফিরিয়ে আনতে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এরপর জ্ঞান ফিরলে ভোর পাঁচটার দিকে খুলনা থেকে গাড়িতে সেটিকে মোংলা ফুয়েল জেটিতে নিয়ে লঞ্চে তোলা হয়। এরপর শ্যালা নদী ধরে আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম সেন্টারের পাশে বনে সেটিকে অবমুক্ত করা হয়।

খুলনা বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বন্য প্রাণী উদ্ধারে আমাদের আধুনিক যানবাহন ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। আমরা যে খাঁচায় বাঘ নিয়ে এসেছি, এটা ঠিক না। অবমুক্তি ম্যানুয়ালি না করে অটোমেটিক যানবাহন ব্যবহার করাটাই উত্তম। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে আমরা এ ধরনের সফলতার উদাহরণ আরও তৈরি করতে পারব।’