চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার ভরাট করা হচ্ছে পুকুর। নগরের মধ্যম হালিশহর এলাকায় পুকুর ভরাট করে এভাবে তৈরি করা হচ্ছে বসতঘর
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার ভরাট করা হচ্ছে পুকুর। নগরের মধ্যম হালিশহর এলাকায় পুকুর ভরাট করে এভাবে তৈরি করা হচ্ছে বসতঘর

চট্টগ্রামের পরিবেশ

৪ দশকে ৩ হাজার জলাধার বিলীন

জলাধার বিলীন হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা।

লালখান বাজার মোড় থেকে হাই লেভেল সড়ক ধরে এগোলেই শহরের চেনা ছবি—ঘিঞ্জি ভবন, সরু গলি, বাস-অটোর ভিড়ে থেমে থেমে চলা। কিছু দূরে গিয়ে ডান দিকে ঢুকলেই তুলা পুকুর বস্তি। এখন সেখানে প্রায় ৩০০ ঘরে হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। বস্তির ভেতরে ঢুকলে কে বলবে এই জায়গাটার বুকেই একসময় ছিল ২ একরের পুকুর, চারদিকে তুলাগাছের সারি, বর্ষায় জল টইটম্বুর, গরমে কচুরিপানার ছায়া?

তুলা পুকুর বস্তির বাসিন্দা মোহাম্মদ ইমন ২৯ বছরের তরুণ। শৈশবের কথা মনে করতেই একটু থমকে যান। বলেন, ‘ছোটবেলায় এই পুকুরে পানি দেখেছি। পরে একসময় থেকে মাটি পড়ে, আবর্জনা পড়ে ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গেল।’

এই এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নুরুল ইসলামের স্মৃতিতে তুলা পুকুর এখনো জীবন্ত। তিনি বলেন, ‘এখানেই সাঁতার শিখেছি। গরমে বন্ধুদের সঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছি। বর্ষায় মাছ ধরেছি। পুকুরটা টিকিয়ে রাখা গেল না। এখন আফসোস হয়। এলাকার বাচ্চারা পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করার সুযোগই পেল না।’

একাধিক গবেষণায় উল্লেখ আছে, ১৮২২ সালের দিকে খনন করা হয়েছিল তুলা পুকুর। আয়তন ছিল প্রায় দুই একর। ২০০০ সালের দিকে পুকুরটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে যায়। পরে সেখানে গড়ে ওঠে বস্তি। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি সিদ্দিক আহমেদ, ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিউল আজমসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পুকুরটি ভরাট করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে সিদ্দিক আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

শুধু তুলা পুকুর নয়। চট্টগ্রাম নগরের নানা ওয়ার্ডে, নানা গলিতে এমন আরও শত শত পুকুর, দিঘি, ডোবা, ঝরনা হারিয়ে গেছে। উঠেছে বহুতল ভবন, দোকান, গুদাম, কারখানা, আবাসিক প্রকল্প। পানি ধারণের স্বাভাবিক জায়গা কমেছে, বৃষ্টির পানি নামার পথ সংকুচিত হয়েছে, ভূগর্ভে পানি ঢোকার প্রাকৃতিক দরজা অনেকখানি বন্ধ হয়ে গেছে। গবেষকেরা বলছেন, আজকের চট্টগ্রামে পানি-সংকট, জলাবদ্ধতা আর তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে ধারাবাহিকভাবে জলাধার হারানোর এই দীর্ঘ ইতিহাস বড় কারণ।

জলাধার ভরাটের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, জলাধার ভরাট করা অপরাধ। এখনো যেসব জলাধার টিকে আছে, সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের দায়িত্ব জেলা প্রশাসককে দিতে হবে।

বিলীন ২ হাজার ৭৭৬ জলাধার

চট্টগ্রামের জলাধার নিয়ে গবেষণা আছে, জরিপ আছে, ইতিহাসগ্রন্থও আছে। এসব সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ, স্থানীয় বাসিন্দা-গবেষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা উদ্বেগজনক।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সর্বশেষ জরিপটি সম্পন্ন হয় ২০২৩ সালে। ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, চার দশকে চট্টগ্রাম নগর থেকে বিলীন হয়েছে ২ হাজার ৭৭৬টি জলাধার। এই ভরাটের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের। কোথাও পরিবারে জমি ভাগাভাগি, কোথাও উত্তরাধিকার-জটিলতা, কোথাও জমির উচ্চমূল্যের লোভ—সব মিলিয়ে জলাধারগুলো একে একে হারিয়ে গেছে।

অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং ‘মহানগরী, বিভাগীয় শহর, জেলা শহরের পৌর এলাকা ও সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন (২০০০)’; দুই আইনেই স্পষ্টভাবে বলা আছে, পুকুর, দিঘি, ডোবা বা যেকোনো প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করা নিষিদ্ধ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাস্তবে আইন থাকা সত্ত্বেও মাঠে প্রয়োগ ছিল দুর্বল, এমন অভিযোগ বহুদিনের।

চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার ভরাট করা হচ্ছে পুকুর। ভরাট করে কাঁচা-পাকা ঘর তৈরি করার কারণে চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না পুকুরের। নগরের বায়েজিদের টেক্সটাইল এলাকায়

পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, সিডিএ ও সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ছিল জলাধার যেন ভরাট না হয়, তা নজরে রাখা। কিন্তু সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা, গাফিলতি এবং অনেক ক্ষেত্রে নীরবতার কারণে একের পর এক জলাধার ভরাট হয়েছে। এখনো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১০ সালের আগে জলাধার ভরাটের বিরুদ্ধে নজরদারি ছিল প্রায় নামকাওয়াস্তে। মামলা-জরিমানার নজিরও সীমিত। ২০১০ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধন করার পর পরিবেশ অধিদপ্তর কিছুটা সক্রিয় হয়। মামলার সংখ্যা ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু তত দিনে নগরের কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বহু বড় জলাধারই হারিয়ে গেছে।

ঢাকায় জলাধার কমেছে ১৭ শতাংশ

জলাধার হারানোর সমস্যা শুধু চট্টগ্রামের নয়। অন্য বিভাগীয় শহরগুলোরও চিত্র একই রকম। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তিন দশক আগেও ঢাকার মোট আয়তনের ২০ শতাংশের বেশি এলাকায় জলাভূমি ছিল। কমতে কমতে এখন তা ৩ শতাংশের নিচে নেমেছে। অর্থাৎ, তিন দশকে ঢাকায় জলাভূমি কমেছে ১৭ শতাংশ। গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের মে মাসে।

অনেক গবেষক বলছেন, চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে জলাধার হারানোর গতি আরও বেশি এবং এর প্রভাবও দ্রুত চোখে পড়ছে। পানি-সংকট, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, এমনকি শহরের ভেতরে জীববৈচিত্র্যও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

বছরে গড়ে ১০ শতাংশ করে কমছে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ও অলক পাল ২০২২ সালে সম্পাদনা করেন চট্টগ্রাম মহানগর: ভৌগোলিক সমীক্ষা নামে একটি বই। সেখানে ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাভূমির স্থানিক ও কালিক পরিবর্তন’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়, আয়তনভিত্তিক বিশ্লেষণে চট্টগ্রাম নগরে জলাভূমি বা জলাধার প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে কমছে।

প্রবন্ধে উল্লেখ আছে, কর্ণফুলী নদীর উত্তর তীরের পলল সমভূমিতে অবস্থিত চট্টগ্রাম শহর একসময় ছোট ছোট পাহাড় দিয়ে বেষ্টিত ছিল। ১৯৪৭ সালের দিকে শহরের আয়তন ছিল মাত্র সাড়ে চার বর্গমাইলের মতো। স্বাধীনতার পর অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পে গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম দ্রুত বন্দরনির্ভর নগরী হিসেবে গড়ে ওঠে।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে শহরের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৫ লাখ। ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ লাখে। এই সময়ে শহরের আয়তন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে উঠেছে। সিডিএ এখন প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০০ নতুন বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দেয়। নির্মাণের এই ধারাবাহিক চাপের সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে খেলার মাঠ, খোলা জায়গা ও জলাধার।

চট্টগ্রামের জলাধার নিয়ে ২০২০ সালে জার্নাল অব দ্য ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব রিমোট সেন্সিং নামের সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল: ‘স্পেসোটেম্পোরাল চেঞ্জ অব আরবান ওয়াটার বডিস ইন বাংলাদেশ: আ কেস স্টাডি অব চিটাগাং মেট্রোপলিটন সিটি ইউজিং রিমোট সেন্সিং অ্যান্ড জিআইএস অ্যানালিটিক টেকনিক’। এতে ১৯৮৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের জলাধারগুলোর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের বহু জায়গায় ক্রমাগত দখল হচ্ছে জলাধার। নগরের মধ্যম হালিশহর এলাকায় পুকুর ভরাট করে এভাবে তৈরি করা হচ্ছে বসতঘর

গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮৯ সালে নগরে পুকুর, দিঘি, ডোবা মিলিয়ে জলাধারের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬০৫। ২০০১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫২৬টি। ২০১০ সালে হয় ১ হাজার ৪০০ এবং ২০১৫ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৫২টিতে। মাঠ জরিপ, জিআইএস, উপগ্রহ চিত্র, গুগল আর্থসহ নানা প্রযুক্তির সহায়তায় এ তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন মোরশেদ হোসেন মোল্লা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নতুন আবাসিক প্রকল্প দ্রুত গড়ে ওঠে। একই সময়েই সবচেয়ে বেশি জলাধার ভরাট হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং জমির উচ্চমূল্যের সুযোগ কাজে লাগিয়ে জলাধারগুলো একটার পর একটা ভরাট হয়ে গেছে।

কোন ওয়ার্ডে ভরাট সবচেয়ে বেশি

সিডিএর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সার্ভে বা বিএস জরিপে (১৯৮৪) চট্টগ্রাম নগরে পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ২৯৫। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫১৯টিতে। অর্থাৎ চার দশকে কমেছে ২ হাজার ৭৭৬টি পুকুর।

ওয়ার্ডভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪১টি ওয়ার্ডের কয়েকটিতে ভরাটের মাত্রা ভয়াবহ। যেমন, ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডে একসময় ছিল ৩৭৭টি পুকুর। এখন আছে ১০৫টি। ভরাট হয়েছে ২৭২টি।

২৪ নম্বর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে ছিল ২৮৬টি, এখন আছে ৫৮টি। ভরাট ২২৮টি। ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ডে ছিল ৩৭১টি, এখন আছে ১৬১টি। হারিয়েছে ২১০টি। ৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ডে ছিল ১৮৩টি, এখন আছে মাত্র ২২টি। হারিয়েছে ১৬১টি।

সিডিএর উপ-প্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী প্রথম আলোকে বলেন, এক দশক আগেও আইন শক্তিশালী ছিল না। এখন জলাধার রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেসব জলাধার টিকে আছে, সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে পুকুর-দিঘি ঘিরে বিভিন্ন আয়োজন করা হবে। তখন সচেতনতা বাড়বে।

টিকে আছে শুধু নাম

গত এক মাসে এ প্রতিবেদক নগরের কয়েকটি পুকুর ও দিঘি ঘুরে দেখেছেন। এর মধ্যে আছে ভেলুয়া দিঘি, আসকার দিঘি, ইসহাক সওদাগরের পুকুর, মফিজ চৌধুরীর ঢেবা, মৌলভীপুকুর, কর্নেল দিঘি ও হাজার দিঘি। এসবের কোথাও পাড় ভাঙছে, কোথাও অংশবিশেষ ভরাট, কোথাও চারপাশে দখলের চাপ। জলাধারগুলো অনেকটা ‘টিকে আছে’। কিন্তু লড়াইটা স্পষ্ট।

হালিশহরের রামপুর নয়াবাজার এলাকায় হাজার দিঘি নামের ঐতিহ্যবাহী দিঘির বড় অংশ ভরাট হয়ে গেছে। এ নিয়ে ২০১৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর একটি মামলা করে, যা এখনো বিচারাধীন। সরেজমিনে দেখা যায়, চারপাশে দোকানপাট ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে, পানি নেই বললেই চলে। সল্টগোলা ক্রসিং এলাকায় মো. ইসহাক সওদাগরের পুকুর পুরোপুরি ভরাট হয়েছে প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর আগে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, পরিবারের উদ্যোগে মাটি ফেলে ভরাট করা হয়।

চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ ডেবার পুকুরপাড়ে তৈরি হয়েছে এমন নানা স্থাপনা

চান্দগাঁও মোহরা এলাকায় একটি পুকুরের প্রায় ১৯ শতাংশ আয়তন ভরাট করা হয়েছে। ভবন নির্মাণের জন্য পুকুর ভরাট করেন স্থানীয় কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘পুকুর ভরাট করা যায় না, এটা আমি জানতাম না।’

শহরের অনেক জায়গায় আবার জলাধার নেই, আছে কেবল নাম। আন্দরকিল্লার ‘দেওয়ানজি পুকুর লেন’ তার উদাহরণ। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১৫০ বছর আগে এখানে ‘দেওয়ানজি পুকুর’ খনন হয়েছিল; আয়তন ছিল প্রায় ৮৪ শতক। ১৯৯৮ সালের দিকে তা পুরোপুরি ভরাট হয়ে যায়। এখন পুকুর নেই, নাম আছে।

আন্দরকিল্লায় একসময় ‘রাজাপুকুর’ নামে তিন একরের পুকুর ছিল। স্থানীয় লোকজন বলেন, ১৯৯০ সালের দিকে ভরাট করে সেখানে বহুতল আবাসিক ভবন গড়ে ওঠে। এখন কেবল ‘রাজাপুকুর লেন’ নামটা টিকে আছে। একইভাবে মুন্সি পুকুর, কারবালা পুকুর, হাজারি পুকুর, ধাম্মো পুকুর, মাইল্যার পুকুর—এগুলোও অনেক ক্ষেত্রে আজ শুধু ঠিকানা, জলাধার নয়।

একসময়ের সামাজিক জীবন, আজকের কংক্রিট

চট্টল গবেষক আবদুল হক চৌধুরী চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা বইতে লিখেছেন, চট্টগ্রামে ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে অনেক বাড়ির পেছনে থাকত মেয়েদের পুকুর, সামনে পুরুষদের পুকুর। একটি বাড়িতে দুটি পুকুর যেন স্বাভাবিক। কোনো বাড়ির পেছনে পুকুর না থাকলে ভালো বৈবাহিক সম্পর্ক করা যেত না—এমন সামাজিক রীতির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। জলাধারকেন্দ্রিক সেই জীবনধারা আজ প্রায় হারিয়ে গেছে।

দিঘির ক্ষেত্রে ছবিটা আরও করুণ। চৌধুরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি প্রণীত চট্টগ্রামের ইতিহাস গ্রন্থে চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশে বিভিন্ন ব্যক্তি বা বংশের নামে খনন করা ৩৭৬টি দিঘির কথা উল্লেখ আছে। তালিকায় আছে রানীর দিঘি, কমলদহ দিঘি, হরগোবিন্দ কানুনগোর দিঘি, দেওয়ান গৌর শঙ্করের দিঘি, কৈলাসীর দিঘি। তার অনেকগুলোই এখন নেই।

চকবাজার এলাকায় প্রায় ছয় একর জায়গাজুড়ে ছিল কমলদহ দিঘি। বলা হয়, নবাব অলি বেগ খাঁকে সম্মান জানিয়ে বিত্তশালী শ্যাম রায় দিঘিটি খনন করান। এখন সেখানে উঁচু ভবন, বাসাবাড়ি, পোশাক কারখানা, কমিউনিটি সেন্টার ও দোকানপাট।

জমিদার হামজা খাঁ ১৬৮২ সালে শহরের উপকণ্ঠে গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেন, পাশে খনন করেন একটি বড় দিঘি—‘হামজার দিঘি’। সেটিও হারিয়ে গেছে বহু আগেই।

অবশ্য এখনো কিছু জলাধার আছে। কিন্তু অযত্ন, দখল, আবর্জনা আর চারপাশে স্থাপনার চাপে সংকুচিত হচ্ছে। রানীর দিঘি, আসকার দিঘি, পদ্মপুকুর, খাজা দিঘি, মুন্সি পুকুর, আগ্রাবাদ ঢেবার দিঘি, হাজার দিঘি, কারবালা পুকুর, কাজীর দিঘি—তালিকা দীর্ঘ।

পানি নেই লাইনে, পানি কিনে খেতে হয়

জলাধার হারানো যে কেবল পরিবেশের সমস্যা, তা নয়। এটি নিত্যদিনের জীবনযাপনেও এসে পড়ে। উত্তর পতেঙ্গার মুসলিমাবাদ এলাকায় ওয়াসার পানির লাইন নেই। ফলে পানি-সংকট এখানে প্রতিদিনের ঘটনা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. খোরশেদ শৈশবে যেসব পুকুরে সাঁতার কেটেছেন, সেগুলো ভরাট হয়ে গেছে। এখন নলকূপেও পানি ওঠে না; যা ওঠে, তা–ও লবণাক্ত। তিনি বলেন, ‘মাসে গড়ে পাঁচ হাজার টাকার পানি কিনতে হয়। তবু সংকট কাটে না।’

একই এলাকার চাকরিজীবী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমারও মাসে চার হাজার টাকার মতো পানি কিনতে হয়। মানুষ পানি না পেয়ে হাহাকার করছে। সমাধানের পথ দেখি না।’

গত এক মাসে নগরের ৩০টি এলাকার ৫০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাঁদের বেশির ভাগের কথাই এক, সুপেয় পানির সংকট ভয়াবহ। পতেঙ্গা, কাটগড়, বন্দর, ইপিজেড, হালিশহর, উত্তর কাট্টলি, আকবরশাহ—অনেক এলাকায় অবস্থাটা বিশেষভাবে নাজুক।

কৈবল্যধাম এলাকার ইকবাল উদ্দিনের অভিজ্ঞতা খুব স্পষ্ট। তিনি বলেন, ২০০৬ সালে তাঁর বাড়িতে ১০০ ফুট গভীরতায় নলকূপে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যেত। ২০২২ সাল থেকে সেই নলকূপ অকেজো। এখন তাঁকেও কিনে পানি নিতে হয়।

ওয়াসার তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে কৈবল্যধামে পানি তুলতে ১৪০ ফুট পর্যন্ত খোঁড়ালেই চলত; এখন পানি পেতে ৩৮০ ফুট পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। অর্থাৎ পানি তুলতে আগের চেয়ে প্রায় ২৪০ ফুট বেশি গভীরতা প্রয়োজন হচ্ছে। খরচও বাড়ছে, চাপও বাড়ছে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, নগরে এলাকাভেদে প্রতিবছর গড়ে ৬ ফুট করে পানির স্তর নিচে নামছে। ২০১৮ সালে চুয়েটের একদল গবেষক নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে ভূগর্ভস্থ পানির স্থিতিতল নিয়ে প্রকল্পভিত্তিক গবেষণা করেন। ১৯৬৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণা দলের নেতৃত্বে ছিলেন পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ কুমার পাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এলাকাভেদে প্রতিবছর ৬ ফুট করে পানির স্তর নিচে নামছে।

গবেষকেরা বলছেন, ভূগর্ভে পানি ঢোকার প্রাকৃতিক পথ হিসেবে কাজ করে জলাধার। পুকুর-দিঘি বিলীন হয়ে যাওয়ায় সেই পুনর্ভরণব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক জায়গায়। ফলে একদিকে নলকূপ অকেজো হচ্ছে, অন্যদিকে পানির জন্য গভীরতা বাড়াতে হচ্ছে। খরচ বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ।

মামলা হাতে গোনা

আইন আছে, শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু মাঠে প্রয়োগ সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম নগর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫—এই এক দশকে পুকুর ও জলাধার ভরাট নিয়ে মামলা হয়েছে অন্তত ৪৭টি। এ সময়ে কত জলাধার ভরাট হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। তবে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও গবেষণার তথ্য মিলিয়ে যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে বোঝা যায়, মামলার সংখ্যা ভরাটের তুলনায় খুবই কম।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, ‘অনেক সময় পরিবার-পরিজনের সম্মতিতেই পুকুর ভরাট হয়। এসব খবর আমাদের কাছে আসে না। তবে এখন নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। খবর পেলেই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

বাস্তবতা হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভরাট হয়ে যাওয়ার পর বা কাজ শেষের দিকে গিয়ে তদারকি সংস্থাগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, এমন অভিযোগ বহু এলাকাবাসীর।

পুকুর ভরাটের অভিযোগে আলোচিত মামলাটি হয় ২০২৫ সালের ১ জুলাই। দক্ষিণ মধ্যম হালিশহরের কোরবান আলী শাহ রোডের পাশে ‘হাটের পুকুর’ ভরাটের ঘটনায় মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রায় ৪০ শতক আয়তনের পুকুরটি এজাহার অনুযায়ী, মাটি ও আবর্জনা ফেলে ভরাট করেছেন মামুনুল কবির চৌধুরী, তাঁর ভাই মিজানুল কবির চৌধুরী ও স্থানীয় কামাল উদ্দিন। সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরটিতে আর পানি নেই। পুরো জায়গা ঘাসে ঢেকে গেছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ধীরে ধীরে ফেলা মাটি ও আবর্জনায় পুকুরটি কার্যত মুছে গেছে।

জানতে চাইলে মামুনুল কবির চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ভরাট করিনি। ময়লা পড়ে পড়ে নিজে থেকেই ভরাট হয়েছে।’

অপূরণীয় ক্ষতি

চট্টগ্রাম শহরে জলাধার হারানোর ক্ষতি এখন আর ‘ধারণা’ নয়, প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। বর্ষা এলেই কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে শহরের বড় অংশ জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পুকুর-দিঘি একসময় বৃষ্টির পানি ধরে রাখত, ধীরে ধীরে বের করে দিত, ড্রেনের অতিরিক্ত চাপ সামলাত। জলাধার কমে যাওয়ায় পয়োনিষ্কাশন–ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যে পানি আগে দ্রুত নেমে যেত, এখন তা থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

জলাবদ্ধতা শুধু যান চলাচল বা অফিস-স্কুলের সময়সূচি নষ্ট করে না। মাসের পর মাস জমে থাকা নোংরা পানি জনস্বাস্থ্যের ওপরও চাপ তৈরি করে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ত্বকজনিত রোগ, পেটের রোগসহ নানা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। হাসপাতালগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, বর্ষা শেষে রোগীর চাপও বাড়ে।

নগরের সল্টগোলা রেলক্রসিং এলাকায় পুকুর ভরাট করে এভাবে তৈরি করা হচ্ছে বসতঘর

আরেকটি বড় হুমকি তাপমাত্রা। গবেষকেরা বলছেন, জলাধার কমে যাওয়ায় শহরের ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব বাড়ছে। কংক্রিটের দালান, পিচঢালা সড়ক, যানবাহনের ধোঁয়া—এসবের মধ্যে পুকুর-দিঘি ছিল শহরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখার ভারসাম্যকারী উপাদান। জলাধার, গাছপালা আর খোলা জায়গা মিলেই তৈরি হয় নগরের ‘স্বতন্ত্র জলবায়ু’। সেটি সংকুচিত হওয়ায় শহরের ভেতর তাপ বেশি জমে থাকছে, রাতে দ্রুত কমছে না, বাতাসের আর্দ্রতার ভারসাম্যও বদলে যাচ্ছে।

জলাধার হারিয়ে যাওয়ায় ধ্বংস হচ্ছে জলজ উদ্ভিদ, মাছ, ব্যাঙ, নানা পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাস। শহরতলির যে জলাধারগুলো একসময় ছিল পাখি-ব্যাঙ-কাঁকড়া-ঝিনুক-ছোট মাছের বহুমাত্রিক আবাসস্থল, তার অনেকগুলোই এখন মাটি, ইট, পলিথিন আর আবর্জনার স্তূপ।

ঝুঁকি বাড়বে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল প্রথম আলোকে বলেন, একটি নগরের জন্য অন্তত ১৫ শতাংশ জলাধার থাকা প্রয়োজন। চট্টগ্রামে জলাধার ভরাট চলতে থাকলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাকৃতিক জলাধার টিকবে না। তখন পানি-নিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা, তাপ—সব সংকটই আরও তীব্র হবে।

নগরের বাসিন্দা ও গবেষকেরা বলছেন, এখন আর আলাদা উদ্যোগে কাজ হবে না—দৃশ্যমান ও সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। তাঁদের প্রস্তাব, জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে একটি ‘কেন্দ্রীয় জলাধার সংরক্ষণ টাস্কফোর্স’ গঠন করা উচিত। নগরের সব পুকুর-দিঘির অবস্থান, আয়তন ও মালিকানা যাচাই করে গেজেটভুক্ত করার কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। সিডিএকে জলাধারের সীমানা চিহ্নিত করে মাঠপর্যায়ে স্থায়ী চিহ্ন, সাইনবোর্ড ও নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চোখের সামনেই একের পর এক জলাধার ভরাট হয়ে গেছে; কোথাও নামমাত্র নোটিশ, কোথাও জরিমানার ঘোষণা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল মৌন সমর্থনের মতো নীরবতা। এখন অবশিষ্ট জলাধারগুলো জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে প্রধানত সিডিএ ও জেলা প্রশাসনকে। নইলে চট্টগ্রামের জল, জলবায়ু, জীবন—সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে।’