
গারো পাহাড়ের বন ঘেঁষে বিস্তীর্ণ ধানখেত। গোধূলির আগে বন থেকে এক পাল হাতি নেমে এসেছে সেই ধানখেতে। কয়েক শ মিটার দূরে উৎসুক শতাধিক মানুষ। পালের শুরুতে থাকা একটা হাতি অন্যদের পেছনে রেখে এগিয়ে আসছে ধানখেত ধরে। কিছুদূর আসার পর ধানখেতের ভেতরে পাতা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে লুটিয়ে পড়ল হাতিটি। আহত হয়ে তড়পাতে থাকা হাতির অবস্থা দেখে উল্লাস করছিল উপস্থিত লোকজন।
এমন একটি ভিডিও এসেছে এই প্রতিবেদকের কাছে। জানা গেছে, ঘটনাটি গত বৃহস্পতিবারের। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরের কাছে। এখানে গারো পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে থাকা ধানি জমিতে হাতির আগমন ঠেকাতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতেছে স্থানীয় লোকজন। তামার তৈরি জিআই তার দিয়ে পাতা এসব ফাঁদে জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার এ রকম একটি তারে জড়িয়ে হাতিটি আহত হয়। বন্য প্রাণীর প্রতি সংবেদনশীল স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বলছেন, এ রকম ফাঁদ পাতা হয়েছে এক কিলোমিটারজুড়ে। ফাঁদের আরও ভিডিও ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে।
এসব ফাঁদ উচ্ছেদ করতে গেলে স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। তাঁদের অভিযোগ, নালিতাবাড়ী উপজেলার নোয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মান্নান স্থানীয় লোকজনের প্ররোচিত করে বনকর্মীদের ওপর হামলা করিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার হাতি হত্যাচেষ্টার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও ইউপি সদস্য মো. মান্নান। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমে’র (ইআরটি) সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, হাতিদের নিরাপদে ফেরাতে তাঁরা তৎপর হতে পারেননি স্থানীয় লোকজনের বাধার কারণে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে ৩২টি হাতি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে নোয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নাকুগাঁও বন্দরের পশ্চিমে ৩০০ থেকে ৪০০ একর জমিতে ধান চাষ হয়। হাতি তাড়াতে জেনারেটর দিয়ে স্থানীয় লোকজন বাতি জ্বালান। সেসব জেনারেটর দিয়ে মাঝেমধ্যে কৃষকেরা বৈদ্যুতিক তারে সংযোগ দেন।
তবে মিজানুর রহমান তাঁর সহযোগিতায় এসব তারে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। একই সঙ্গে বনকর্মীদের ওপর হামলার বিষয়টিও অস্বীকার করেন।
শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার দেওয়ান আলী প্রথম আলোকে বলেন, যত দিন ধান কাটা হয়নি, তত দিন সবাই মিলে হাতি তাড়াতেন। এখন যখন ধান অর্ধেক কাটা হয়ে গেছে, অন্যরা একা হয়ে গেছেন। ফলে তাঁরা ধান বাঁচাতে জিআই তার দিয়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতছেন।
বনকর্মীদের ওপরে হামলার অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য ইউপি সদস্য মো. মান্নানকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।
১০ বছরে গারো পাহাড় অঞ্চলে ৩২ হাতি হত্যা
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে ৩২টি হাতি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে মাত্র সাতটি। থানায় মামলা হয়েছে একটি। এ ছাড়া বন আদালতে মামলা হয়েছে একটি।
শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার দেওয়ান আলী প্রথম আলোকে বলেন, যত দিন ধান কাটা হয়নি, তত দিন সবাই মিলে হাতি তাড়াতেন। এখন যখন ধান অর্ধেক কাটা হয়ে গেছে, অন্যরা একা হয়ে গেছেন। ফলে তাঁরা ধান বাঁচাতে জিআই তার দিয়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতছেন।
দেওয়ান আলী বলেন, বৃহস্পতিবারের বৈদ্যুতিক ফাঁদ উচ্ছেদ করতে গেলে বন বিভাগের লোকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখে স্থানীয় লোকজন। এই কর্মকর্তা বলেন, বন্য প্রাণী ফসলের ক্ষতি করলে সরকার ক্ষতিপূরণ দেয়; কিন্তু এসব ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যে প্রক্রিয়া সেটাতে অনাগ্রহ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিপূরণ চান। এক–দেড় মাস অপেক্ষা করতে চান না। গত সপ্তাহেও বন বিভাগের পক্ষ থেকে ফসলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
হাতি হত্যায় সর্বোচ্চ শাস্তি ১২ বছরের কারাদণ্ড
সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া বন্য প্রাণী (নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ) আইন–২০২৬–এর তফসিল–১–এর (ক) অনুযায়ী, হাতিকে পরিবেশের সূচক (ফ্ল্যাগশিপ স্পেসিস) হিসেবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। হাতি হত্যা আমলযোগ্য অপরাধ। একই সঙ্গে এটি অজামিনযোগ্য অপরাধ।
এসব ফাঁদ উচ্ছেদ করতে গেলে স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। তাঁদের অভিযোগ, নালিতাবাড়ী উপজেলার নোয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মান্নান স্থানীয় লোকজনের প্ররোচিত করে বনকর্মীদের ওপর হামলা করিয়েছেন।
আইন অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া বাঘ বা হাতি হত্যা করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য সর্বনিম্ন দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান কার্যকর হবে।
আইনে ৩৭ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন বন অপরাধীকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
এক দশকে বৈদ্যুতিক ফাঁদে ২৬ হাতি হত্যা
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের তালিকায় হাতিকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বন্য প্রাণী হিসেবে মহাবিপন্ন ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ২০১৬ সালে। ওই সময় আইইউসিএনের এক জরিপে বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা নির্ণয় করা হয়েছিল ২৬৮টি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিহত হাতির সংখ্যা ১৪৬। এর মধ্যে ২৬টি হাতিকে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে হত্যা করা হয়েছে। শুধু শেরপুর নয়, জামালপুর, ময়মনসিংহ, রাঙামাটি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে হাতি হত্যায় বৈদ্যুতিক ফাঁদের ব্যবহার বাড়ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতিবিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, কৃষকের সারা বছরের কষ্টের ফসলও যেমন বাঁচাতে হবে, একইভাবে হাতিকেও রক্ষা করতে হবে। শেরপুরে বনাঞ্চলের তুলনায় হাতির সংখ্যা বেশি। কিন্তু সে তুলনায় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেখা যায় না। কোনো ঘটনা ঘটলে কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। স্থানীয় লোকজনকে বছরব্যাপী সচেতন করে তোলা এবং হাতিকে বনে ফেরাতে ইআরটি সদস্যদের সক্ষম করে গড়ে তোলার ওপর বন বিভাগকে কাজ করে যেতে হবে।