নীলাকাশে সাদা মেঘ জানান দিচ্ছে শরতের আগমনী বার্তা। গতকাল কক্সবাজারের ইনানী সমুদ্রসৈকতে।
নীলাকাশে সাদা মেঘ জানান দিচ্ছে শরতের আগমনী বার্তা। গতকাল কক্সবাজারের ইনানী সমুদ্রসৈকতে।

ব্যস্ত শহরেও শরৎ আছে নীল আকাশে, ভোরের গন্ধে

আজি কি তোমার মধুর মূরতি

হেরিনু শারদ প্রভাতে!

হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ

ঝলিছে অমল শোভাতে।

শরৎ/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বর্ষার ভেজা আবহ পেরিয়ে প্রকৃতিতে এখন ধীরে ধীরে বদলের আভাস। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা বাড়ছে, কোথাও কোথাও কাশফুল মাথা তুলছে। ভোরে শিউলির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানী শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছে, ঋতু বদলাচ্ছে।

শরতের ফুল শিউলি

ভাদ্র ও আশ্বিন বাংলার শরৎকাল। এই ঋতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল, শিউলি, শিশির আর নির্মল আলোর ছবি। বর্ষার টানা বৃষ্টির পর প্রকৃতিতে কিছুটা স্বস্তি আসে। বিল-ঝিলের পানিতে শালুক-শাপলা, নদীর পাড়ে কাশবন আর খোলা আকাশের নিচে উড়ে বেড়ায় বকসহ নানা পাখি। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে মাঠে কচি ধানের হেলেদুলে কাটানো কৈশোর। এমন সবুজের সমারোহে কবিমন গেয়ে

ওঠে—

‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা।

নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই—লুকোচুরি খেলা॥’

ভাদ্র মাসে তাল পাকে। তাই দিয়ে বানানো হয় পিঠা

এবার শরৎ এসেছে ভিন্ন এক সময়ে। গত দুই বছরে দেশের রাজনীতি ও সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। আন্দোলন, ক্ষমতার পরিবর্তন, নির্বাচন ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সেই পরিবর্তনের রেশ এখনো আছে মানুষের কথাবার্তায়, চিন্তায়, প্রত্যাশায়। এর মধ্যেই প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে শরৎ নিয়ে হাজির হয়েছে।

তবে শরৎ মানেই যে সব সময় মেঘমুক্ত আকাশ আর কোমল আবহাওয়া, তা নয়। ভাদ্রের গরম অনেক সময় বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। হঠাৎ বৃষ্টি নামে, আবার কিছুক্ষণ পরই দেখা দেয় ভ্যাপসা গরম। কোথাও কোথাও এই মাস ‘তালপাকা ভাদ্র’ নামেও পরিচিত।

শরতে দেখা মেলে এমন নীল আকাশের

শরতের প্রথম সপ্তাহেও বর্ষার রেশ থাকবে। কখনো মেঘলা আকাশ, কখনো বৃষ্টি, আবার বৃষ্টির ফাঁকে রোদের দেখা—এভাবেই শুরু হতে পারে ঋতুটির প্রথম কদিন।

আশ্বিনে অবশ্য আবহাওয়ায় কিছুটা বদল আসে। দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামে একটু আগেই, বাতাসেও টের পাওয়া যায় হিমেল ঋতুর আগমনী আভাস।

শরৎ ফুলেরও ঋতু। শিউলি, বেলি, দোলনচাঁপা, বকুল, মালতী, মধুমালতী, শাপলা ও পদ্ম—বিভিন্ন ফুল এ সময় প্রকৃতিকে আলাদা রূপ দেয়। শিউলির সঙ্গে শরতের সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর। ভোরে গাছতলায় ঝরে থাকা সাদা-কমলা শিউলি দেখলেই বোঝা যায়, শরৎ তার নিজের পরিচয় নিয়ে হাজির হয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথায়—

‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ

এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।’

এই ঋতুর সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক আছে। হেমন্তকে বলা হয় ফসলের ঋতু আর শরৎ সেই ফসলের সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে। ধানখেতে শিষ আসতে শুরু করলে কৃষকের মনে জাগে নতুন আশার আলো।

গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা ও লোকাচারেও শরতের প্রভাব আছে। উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় এখনো ‘ভাদর কাটানি’ নামে একটি লোকাচার প্রচলিত। ভাদ্র মাসের প্রথম তিন থেকে সাত দিন নববধূ যদি স্বামীর মুখ দেখেন, তবে অমঙ্গল হতে পারে, এমন বিশ্বাস থেকে শ্রাবণ মাসের শেষ দিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি চলে যান নববধূরা। এ দেশে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এই উৎসব উত্তরবঙ্গের দিকে বেশি হয়, দক্ষিণবঙ্গ বা অন্যান্য স্থানে ততটা নয়।

শিউলির গন্ধের সঙ্গে আসে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি

শরৎ আবার উৎসবের ঋতুও। শিউলির গন্ধের সঙ্গে আসে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। এরপর লক্ষ্মীপূজা, দীপাবলি। ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। ফলে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনেও তৈরি হয় আলাদা ব্যস্ততা ও আনন্দ।

তবে আগের সেই শরৎ কি এখনো আছে? প্রশ্নটি উঠছে, কারণ নগরায়ণের চাপে কাশবন, খোলা মাঠ, জলাভূমি ও নাবাল জমি দ্রুত কমছে। ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ি, মিরপুর বেড়িবাঁধ, কেরানীগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের মাওয়া কিংবা আড়িয়ল বিলের মতো জায়গায় এখনো শরতের কিছু চেনা দৃশ্য পাওয়া যায়। ছুটির দিনে মানুষ সেখানে যায়, কাশফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে।

উত্তরার দিয়াবাড়িতে সারি সারি কাশফুল। শহরের প্রান্তে গিয়ে শরৎ দেখেন অনেকে

একসময় শরৎ দেখতে আলাদা করে কোথাও যেতে হতো না। বাড়ির পাশের মাঠ, পুকুরপাড় কিংবা গ্রামের পথেই তার দেখা মিলত। এখন শহুরে মানুষকে শরৎ খুঁজতে যেতে হয় শহরের প্রান্তে।

প্রকৃতির আপন নিয়মে শরৎ আসে, আবার নিয়ম মেনেই তাকে বিদায় নিতে হয়। কিন্তু আমাদের হাতে কি থাকবে সেই শরৎকে ধরে রাখার মতো কিছু? তাই ঋতুটি চলে যাওয়ার আগে চারপাশে একটু তাকানো যেতে পারে। হয়তো দেখা যাবে, ব্যস্ত শহরের মধ্যেও শরৎ এখনো আছে কোনো একটুকরো নীল আকাশে, কাশফুলের দোলায় কিংবা ভোরের গন্ধে।