আমাদের সময়ে গ্রামগঞ্জে বানরের খেলা দেখা ছিল বেশ উপভোগ্য। বানর কাঁধে নিয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়ে হাজির হতেন বানরওয়ালা। হাতে থাকত ছোট একটা ডুগডুগি। সেটি অনবরত বাজিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আকৃষ্ট করে জড়ো করতেন। এরপর শুরু হতো বানরের খেলা। বানর কীভাবে ছাতা কাঁধে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যায়, কাজে ফাঁকি দিয়ে কেমন করে ‘কামচুরা’ বউ হয়ে শুয়ে থাকে—এমন হরেক রকম হাস্যরসের স্মৃতি আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে। ডিজিটাল যুগে এমন দৃশ্য বেশ বিরল।
তবে আজকাল বানরের সঙ্গে মানুষের নানা রকম বাঁদরামি দেখা যায়। চিড়িয়াখানায় অনেকে অকারণে বানরকে ভেংচি কাটে, ঢিল ছোড়ে, এটা-ওটা ছুড়ে মারে। বানর যতক্ষণ না কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়, ততক্ষণ পর্যন্ত চলে মানুষের এই বাঁদরামি। বনবাদাড়ে গিয়েও পর্যটকদের এমন আচরণ প্রায়শই চোখে পড়ে। এ দেশের মানুষের এ এক সহজাত চরিত্র।
কয়েক বছর আগে গবেষণার কাজে সুন্দরবনের করমজলে গিয়েছি। শীতের ভোর, চারপাশটা কুয়াশায় ঢাকা। স্রোতস্বিনী পশুর নদের পানিতে ভোরের সোনালি সূর্যের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে বনতলকে আলোকিত করে তুলেছে। জোয়ারের পানি পেয়ে জেগে উঠেছে নানা জাতের কাঁকড়া আর মাছ। করমজলের পুব দিকের ট্রেইল ধরে হাঁটছি। নিরিবিলি বুনো প্রাণী পর্যবেক্ষণ ও ছবি তোলাই উদ্দেশ্য। চারপাশ নীরব, কোনো কোলাহল নেই। পর্যটকেরা তখনো এসে পৌঁছেনি করমজলে।
ধীর পায়ে হাঁটছি। হাতে ক্যামেরা, সঙ্গে কোনো ব্যাগ নেই। বনতল থেকে উঁচু করে বসানো কাঠের পাটাতন দেওয়া ট্রেইলে সন্তর্পণে হেঁটে চলেছি। পাশের রেলিংয়ে বসা একটা নেতা গোছের বানর আমার দিকে আড়চোখে তাকাল। আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ দুই পাশের ঘন বনের গাছের ফাঁকে, পাতায়, ডালে। রংবেরঙের ছোট ছোট ফুলঝুরি, মৌটুসি আর কাঠঠোকরা পাখিরা সকালের আহার শিকারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। হঠাৎ সুন্দরবনের বিরল লাল মাছরাঙা আবিষ্কার করলাম বাঁ পাশের একটি সুন্দরীগাছের ডালে। ক্যামেরা তাক করেছি। এমন সময় আমার ট্রাউজারের পকেটে পেছন থেকে কে যেন হাত ঢুকিয়ে দিল বলে মনে হলো। এমন নির্জন বনের রাস্তায় আমার সঙ্গে তো কেউ নেই, তাহলে কে এল আমার পিছু পিছু। ভাবতেই গা শিউরে উঠল। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, সেই নেতা বানর এক হাতে রেলিং ধরে ঝুলে পড়ে আরেক হাত আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি তাকাতেই বানর আলগোছে হাতটা পকেট থেকে সরিয়ে নিল। একটু সরে গিয়ে রেলিংয়ে বসে আমার দিকে অপরাধীর মতো তাকিয়ে রইল।
হরহামেশা দেখা এই বানরের ইংরেজি নাম রিসাস ম্যাকাক। বাংলায় বানর, বান্দর, বাঁদর কিংবা শাখামৃগ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে যে চার প্রজাতির বানর আছে, এর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশের শালবন, পাহাড়ি বনে আছে এরা। সুন্দরবনে আর কোনো বানর কিংবা নর-বানর দেখা না গেলেও একমাত্র এই প্রজাতির বানর বাদাবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। বাদাবনের শ্বাসমূল, ছইলা ও কেওড়া ফল, হেঁতালের মাথি খেয়ে টিকে আছে এরা। কালেভদ্রে কাঁকড়াও শিকার করে।
মানুষের বসতি এলাকার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতায় এই বানর অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে। ফলে বন ছাড়াও দেশের নানা জায়গায় এদের দেখা যায়। যেমন ঢাকার সাধনা ঔষধালয় এলাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ এই বানর বসবাস করছে। তেমনি সিলেটের নানা মাজারে, গাজীপুরের বরমী বাজারে, মাদারীপুরের চরমুগুরিয়া কিংবা নারায়ণগঞ্জের বন্দরে এই বানরের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
চিড়িয়াখানা ও পর্যটন এলাকায় বানরের সঙ্গে মানুষের আচরণ বরাবরই অবন্ধুসুলভ। অনেক পর্যটক বাদাম, চিপস, কলা ইত্যাদি বানরের দিকে ছুড়ে মারেন। ফলে বানরের মধ্যে মানুষের কাছ থেকে খাবার পাওয়ার একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। পরে কোনো পর্যটক খাবার না দিলে বানর হাতের ব্যাগ, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। অনেক সময় বানর কামড়ে ধরে কিংবা খামচি দিয়ে পর্যটকদের রক্তাক্ত করে দেয়।
দেশের বেশ কিছু বানর-থাকা এলাকায় কর্তৃপক্ষ বানরকে খাবার সরবরাহ করে। নিয়মিতভাবে বানরকে খাবার সরবরাহ করলে প্রজননক্ষমতা বেড়ে গিয়ে এদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে মানুষের সঙ্গে বানরের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
বানরের সঙ্গে সংস্রবের ফলে এরই মধ্যে বানর থেকে মানুষের মধ্যে নানা জীবাণুর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তেমনি মানুষ থেকেও বানরের মধ্যে নানা অণুজীব স্থানান্তরিত হয়েছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে চিড়িয়াখানার দর্শক কিংবা বনাঞ্চলে পর্যটকদের বানর থেকে সাবধান থাকতে হবে। বানর আছে এমন পর্যটন এলাকায় হাতে কোনো খাবার বহন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়