ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় শালবনের ভেতরে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় শালবনের ভেতরে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন

গাজীপুর সিটিতে সংরক্ষিত বনে ভাগাড় নির্মাণ

  • ১১ এপ্রিল ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে এসটিএস নির্মাণ শুরু করে।

  • গবেষণা বলছে, গাজীপুরে দুই যুগে বনভূমি ও জলাশয় কমেছে দুই–তৃতীয়াংশ।

ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক ধরে গাজীপুরের মাস্টারবাড়ি পার হলে শালবনের শুরু। সেখানে সারি সারি শালগাছ বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখা পাওয়া গেল বানরের দলের।

বনজুড়ে নির্জনতা। তবে গাজীপুর ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের মূল প্রবেশপথের একটু আগে সেই নির্জনতা নেই, বরং খননযন্ত্রের (এক্সক্যাভেটর) শব্দ শোনা গেল। গতকাল সোমবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, চারপাশে শালগাছের মধ্যে একটি ধানি জমি। ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক ঘেঁষে সে ধানি জমির এক পাশে সদ্য নির্মিত কাঁচা রাস্তা। অন্য পাশে টিনের ছাউনির ঘর।

বন বিভাগের আপত্তি শোনেননি সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। ছাড়পত্র নেননি পরিবেশ অধিদপ্তরের।

জমিতে দুটি খননযন্ত্র মাটি খুঁড়ছিল। মাটি স্তূপ করে রাখছিলেন প্রায় ২০ জন শ্রমিক। একটু দূরে বনের ভেতর ছায়ায় দাঁড়িয়ে তাঁদের কাজ তদারক করছিলেন এক তরুণ। নাম বললেন ইফতি। পুরো নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানালেন।

ইফতি বললেন, সেখানে একটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করা হবে। তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) পক্ষ থেকে সাইট সুপারভাইজার হিসেবে কাজ তদারক করছেন।

এসটিএস হলো বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য একত্র করে রাখার ভাগাড়। পরে সেখান থেকে তা স্থায়ী ভাগাড়ে নিয়ে ফেলা হয়।

দেশের মধ্যাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের শালবন। ১১ এপ্রিল উদ্যানের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে সংরক্ষিত বনের ভেতরে এসটিএস নির্মাণের কাজ শুরু করে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। জাতীয় উদ্যানটি বন আইন-১৯২৭ সালের ২০ ধারায় ঘোষিত এটি একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যেখানে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। তবে জিসিসির দাবি, যেখানে তারা ভাগাড় নির্মাণ করছে সেটি ব্যক্তিগত জায়গায় বন বিভাগের নয়।

যদিও সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া বন্য প্রাণী (নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ) আইন অনুযায়ী, জাতীয় উদ্যানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা ও স্তূপ করা নিষিদ্ধ। উদ্যানের সীমানা থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ইটভাটা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে এ আইনে।

জানতে চাইলে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের দায়িত্বে থাকা বন বিভাগের ঢাকা অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ) এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গায়ের জোরে উদ্যানের দেয়াল ভেঙে ময়লা ফেলার স্থাপনা নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ অপ্রত্যাশিত।

ইকবাল হোছাইন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললেও তাঁরা কাজ বন্ধ করেননি। আমরা বাধা দেওয়ার পর তাঁরা শত শত লোক জড়ো করে। পরে দেয়াল ভেঙে ভাগাড় নির্মাণের কাজ শুরু করে।’

বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে বন অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছেন বলে জানান ইকবাল হোছাইন। বন বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, তাঁরা বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছেন।

১৫ এপ্রিল বন বিভাগ থেকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন ভাওয়াল উদ্যানের ৬ নম্বর প্রবেশপথে ২০২৪ সালের শুরুতে বর্জ্য ফেলতে শুরু করে। এসব বর্জ্যের সংস্পর্শে এসে শালবনের পাখি ও বানর অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দুর্গন্ধে অস্বস্তিতে পড়েন দর্শনার্থীরাও। বর্জ্য ফেলা বন্ধে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।

২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি জাতীয় উদ্যানের বাউপারা বিট এলাকায় রাতে বর্জ্য ফেলতে দেখে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ময়লার গাড়ি জব্দ করে বন বিভাগ। পরে আদালতে বর্জ্য না ফেলার অঙ্গীকার করে ময়লার গাড়িটি নিয়ে যায় গাজীপুর সিটি করপোরেশন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় দিনে প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে করপোরেশন সংগ্রহ করতে পারে এক হাজার টনের মতো বর্জ্য। বাকিটা রাস্তাঘাটের আশপাশে ফেলা হয়।

উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন না করে বনের ভেতরে কেন এসটিএস নির্মাণ করা হচ্ছে, জানতে চাইলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, যেখানে এসটিএস নির্মাণ করা হচ্ছে, তা ব্যক্তিমালিকানায় থাকা জমি।

বন বিভাগ বলছে, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের চৌহদ্দির মধ্যে আটটি মৌজায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে। এসব জমিতে কৃষিকাজ করা যায়। তবে ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই জমিতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সরকার এসব ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল। তবে অর্থসংকটে তা সম্ভব হয়নি।

আইন লঙ্ঘন করে কীভাবে এসটিএস নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন, জানতে চাইলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে গত রোববার এসটিএসের জায়গাটি পরিদর্শন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের একটি দল।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক আরেফিন বাদল প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশ আইন অনুযায়ী এসটিএস নির্মাণ করতে হলে পরিবেশগত ও অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন কোনো ধরনের ছাড়পত্র নেয়নি। তিনি বলেন, ‘বনের ভেতরে ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গা হলেও আমরা এসটিএস নির্মাণ না করার বিষয়ে প্রতিবেদনে পরামর্শ দিয়েছি।’

রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) ২০২৩ সালে করা এক গবেষণায় বলেছে, গাজীপুরে দুই যুগে বনভূমি ও জলাশয় কমেছে দুই–তৃতীয়াংশ; সেই সঙ্গে বেড়েছে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণ। ২০০০ সালে জেলায় বনভূমির পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৯৪৩ হেক্টর; যা কমে ২০২৩ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৭৪ হেক্টরে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির প্রথম আলোকে বলেন, বনের ভেতর এসটিএস নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে এ নির্মাণকাজ বন্ধ করে জিসিসিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।