ইফতেখারুজ্জামান
ইফতেখারুজ্জামান

অভিমত: ইফতেখারুজ্জামান

মৌলিক সংস্কারকে উপেক্ষা সবার জন্য আত্মঘাতমূলক

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশ হতাশাজনক। সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার, মানুষের সমান অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে বিচারক নিয়োগ, স্বাধীন বিচার সচিবালয়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অতীত অভিজ্ঞতার পরও মৌলিক সংস্কারের ক্ষেত্রগুলোকে উপেক্ষা করাটা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের জন্য আত্মঘাতমূলক।

যে অভিজ্ঞতাটার ভেতর দিয়ে বিগত কর্তৃত্ববাদী সময়ে দেশবাসী, এখনকার সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল গেছে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে তাদের শিক্ষা গ্রহণ করার কথা। তারা প্রায় সবাই ওই ক্ষেত্রগুলোতে আইনগত দুর্বলতা; বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার কমিশনের মতো সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণের মাধ্যমে অকার্যকারিতার ফলে বহুমাত্রিক অধিকারহরণের ভুক্তভোগী। যদি তারা কর্তৃত্ববাদ ও রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে, তবে অধ‍্যাদেশগুলো হুবহু বিল আকারে অবিলম্বে সংসদে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে দেশবাসীকে তার প্রমাণ দেওয়া উচিত। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের উদ্বেগের জায়গাটা হচ্ছে, বাস্তবে সেই শিক্ষাটা কোথায়?

ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, দুর্নীতি প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। কাজেই এ বিষয়গুলোকে এভাবে অবজ্ঞা করাটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি মানুষের মধ্যে একধরনের হতাশা সৃষ্টি করে—জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য যে মৌলিক জায়গাগুলো অপরিহার্য, সেই সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো কেন বর্তমান সরকার বা সংসদ উপেক্ষা করছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে তারা সংসদে নির্বাচিত হয়েছে, তার সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ বিষয়ে একটা ডিলেমা (দোটানা) হয়েছে। কারণ, দুদক আইনের সংশোধনে জন্য যে অধ্যাদেশটা করা হয়েছে, সেই অধ্যাদেশের মধ্যে অনেক দুর্বলতা আছে। অধ্যাদেশটা যখন প্রণীত হয়, তখনই আমরা সেগুলো নিয়ে কথা বলেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সেগুলো নিয়ে দেনদরবার হয়েছে, তারা একসময় রাজিও হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো থেকে সরে এসেছে। কারণ, ভেতর থেকেই প্রতিরোধ ছিল, আমলাতন্ত্র থেকে প্রতিরোধ ছিল। 

সেই অবস্থার আবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে এখন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দুদক সংস্কারের অধ্যাদেশটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। সে কারণে আপাতত এটিকে স্থগিত করার বিষয়টির সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু স্থগিত করাটা যেন একটা চিরস্থায়ী ব্যবস্থা না হয়ে যায়।

দুদক সংস্কার কমিশনে যেসব প্রস্তাবে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণ একমত হয়েছিল, কোনো প্রকার নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) ছাড়া যেগুলো জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং জুলাই সনদের বাইরেও দুদক-সংক্রান্ত অনেক প্রস্তাবে বিএনপিসহ সব দল একমত হয়েছিল। ওই বিষয়গুলোকে মানদণ্ড হিসেবে ধরে নিয়ে বা সেগুলোর আলোকে অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে অবিলম্বে দুদক অধ্যাদেশটাকে সংশোধন করা উচিত হবে। সেই সংশোধনীর ওপর ভিত্তি করে এটিকে আইনে রূপান্তর করা উচিত। 

দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের অবস্থা সৃষ্টি করে সরকার এখন দুদককে যে অকার্যকর করে রাখল, এর মাধ্যমে তারা কী বার্তা দিচ্ছে; তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর ফলে সরকারের ওপর এখন বিশেষ দায়িত্ব হয়ে পড়েছে যে তারা যেন অবিলম্বে অধ্যাদেশটিকে সংশোধন করে এবং তার ওপর ভিত্তি করে অবিলম্বে নতুন দুদক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। 

দুদক, পুলিশ কমিশন ও তথ‍্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ স্থগিতের সুপারিশপ্রাপ্ত বাকি অধ‍্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে অবিলম্বে আইনে পরিণত করতে হবে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি