বিপদ কখনো বলে-কয়ে আসে না। আর জীবনের কঠিন কোনো মুহূর্তে দাঁড়িয়েই অনেক সময় আমরা সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করি আর্থিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা। সেই সুরক্ষার একটি মাধ্যম হতে পারে ইন্স্যুরেন্স। কিন্তু একটি ইন্স্যুরেন্স পলিসি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে তার প্রয়োজন বুঝে সঠিক সমাধানটি বেছে নিতে সহায়তা করার পেছনে কাজ করে যান অসংখ্য ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট (এফএ)।
গ্রাহকের কাছে তাঁরা (এফএ) ইন্স্যুরেন্সের পরিচিত মুখ। অথচ তাঁদের নিজেদের পথচলার গল্পগুলো অনেকটাই থেকে যায় আড়ালে। কীভাবে তাঁরা এই পেশায় এলেন, মানুষের অনাস্থা ও প্রচলিত ভুল ধারণার মুখোমুখি হয়ে কীভাবে এগিয়ে চলেছেন কিংবা অন্যের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে কীভাবে বদলে গেছে তাঁদের নিজেদের জীবন—এসব গল্পও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এমনই দুই ভিন্ন পথের মানুষ তরিকুল ইসলাম ও পারভিন আক্তার। একজনের কাছে এই পেশা হয়ে এসেছিল জীবনের কঠিন সময়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ, অন্যজন বেছে নিয়েছিলেন মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকে। পথ আলাদা হলেও তাঁদের গল্প এসে মিশেছে একটি জায়গায়—মানুষের আস্থা অর্জনে।
করোনা মহামারীর সময়ে চাকরি চলে যাওয়ার পর তরিকুল ইসলাম জানতেন না পরের মাসে সংসার কীভাবে চালাবেন। একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারানোর পর যোগ দিয়েছিলেন গার্মেন্টসে। কিন্তু গার্মেন্টসে সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেও সেই তুলনায় পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক মেলে না তাঁর। সেখানে একদিন দেখা হয় সিদ্ধিরগঞ্জ এরিয়া অফিসের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে জানতে পারেন ‘গার্ডিয়ান’ সম্পর্কে। তরিকুল ইসলাম প্রথমে এক মাস পার্ট টাইম গার্ডিয়ানে কাজ করলেও পরবর্তীতে গত বছরের নভেম্বরে তিনি এফএ হিসেবে যোগ দেন গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডে।
শুরুতে কাজটি ছিল তরিকুল ইসলামের জন্য আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের জীবিকার পাশাপাশি অন্য মানুষকে আর্থিক সুরক্ষা প্রদানে সাহায্য করার দিকটি তাঁকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সামনে এসেছে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। ইন্স্যুরেন্স নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে যে গৎবাঁধা ভ্রান্ত ধারণা তা বুঝতে তরিকুলের বেশি সময় লাগেনি। তিনি এটাও অনুধাবন করেন যে এটা রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়।
তরিকুল বলেন, ‘এটা (ইন্স্যুরেন্স) আসলে শেখার বিষয়। যত শিখতে পারব, তত ভালো সেবা দিতে পারব।’ তাঁর মতে, সঠিকভাবে ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং’ করতে পারলে এই পেশার চ্যালেঞ্জিং দিকগুলোও সহজে মোকাবিলা করা যায়।
এ নিয়ে তরিকুলের একটি ব্যক্তিগত গল্প রয়েছে। তিনি যে মেসে থাকতেন, সেখানকার মালিকের সঙ্গে তাঁর প্রায়ই গল্প হতো। মেসমালিক একদিন তাঁর কাজের কথা জানতে চান। তরিকুল ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করেন শুনে তিনি খানিকটা তাচ্ছিল্যের সুরেই বলেছিলেন, আপনি একজন শিক্ষিত ভদ্রলোক মানুষ হয়ে এরকম কাজ করেন কেন?
তরিকুল তর্কে যাননি। বরং মেস–মালিককে আরও বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন কিন্তু কী করবেন ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। একদিন তরিকুল তাঁকে নিয়ে যান ঢাকায় গার্ডিয়ানের হেড অফিসে। সেখানে কোম্পানির কার্যক্রম, ক্লেইম প্রসেস ও পলিসি সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর তরিকুলকে বলেন, তিনি তাঁর পরিবারের কথা চিন্তা করে গার্ডিয়ানে পলিসি করতে চান। তরিকুল মেস–মালিকের জন্য যে প্ল্যানটি প্রয়োজন সেটা নিতে সহযোগিতা করেন।
পরে সেই মেস–মালিক নিজেই ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ শুরু করেন। তরিকুলের হাত ধরে আরও সাতজন এই পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
এই অভিজ্ঞতা তরিকুলকে শিখিয়েছে মানুষের আস্থা অর্জনে শুধু পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তাঁদের কথা শোনা, প্রয়োজন বোঝা এবং সঠিক তথ্যের মাধ্যমে উপযুক্ত সমাধানটি খুঁজে দিতে পারা। তাঁর কাছে তাই এই পেশায় শেখা, ধৈর্য আর মানুষের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাই এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্র।
আরেকজন ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট পারভিন আক্তারের পথটা অবশ্য আলাদা। স্বচ্ছল পরিবারে বড় হলেও তিনি আগে কখনো চাকরি করেননি। মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই ২০২৩ সালে ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ শুরু করেন।
পরভিন বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলে ভালো লাগবে। কাউকে একটু সহযোগিতা করতে পারব, সেটাই বড় কথা।’
সেই উদ্দেশ্য পারভিনের নিজের পরিবারেই একদিন নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল। এক ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর চাচি–শাশুড়ি। কথা বলার অবস্থাও ছিল না। পারভিন প্রথমে তাঁর গার্ডিয়ান আইডি কার্ড দিয়ে চাচি–শ্বাশুড়িকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরবর্তীতে তাঁর বাসা থেকে স্বাস্থ্য কার্ড নিয়ে আসেন। চিকিৎসার ব্যবস্থা হয় ইন্স্যুরেন্সের আওতায়। সুস্থ হওয়ার পর চাচি–শাশুড়ি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মুহূর্তটি আজও মনে পড়ে পারভিনের।
এই অভিজ্ঞতা পারভিনের কাছে ইন্স্যুরেন্সের গুরুত্বকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর যে ইচ্ছা নিয়ে তিনি এই পেশায় এসেছিলেন, নিজের পরিবারের কঠিন সময়ে সেটিই যেন আরও দৃঢ় হয়েছে। তাঁর কাছে তাই ইন্স্যুরেন্স এখন শুধু একটি পেশা নয়, বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম।
তরিকুলের জন্য ইন্স্যুরেন্সের কাজটি ছিল হারানো চাকরির পর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ। পারভিনের কাছে এটি ছিল মানুষের প্রয়োজনে পাশে থাকার সুযোগ। দুজনের পথচলা আলাদা, অভিজ্ঞতাও ভিন্ন। তবে তাঁদের গল্প এসে মেলে একই জায়গায়—মানুষের আস্থা অর্জন।
তরিকুল ও পারভিন সেই অসংখ্য ফিনান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটেরই দুটি মুখ। তাঁদের গল্প মনে করিয়ে দেয়, মানুষের কাছে ইন্স্যুরেন্স পৌঁছে দেওয়ার কাজটি শুধু একটি পলিসি দিয়ে শেষ হয় না; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের প্রয়োজন বোঝা, পাশে থাকা এবং দীর্ঘ সময় ধরে আস্থা গড়ে তোলার এক নিরন্তর যাত্রা।