সুনামগঞ্জের হাওরে চার দিন পর রোদ উঠেছে। এই সুযোগে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে হাওরপাড়ে তুলছেন কৃষকেরা। গতকাল দুপুরে সদর উপজেলার ঝাওয়ার হাওরে
সুনামগঞ্জের হাওরে চার দিন পর রোদ উঠেছে। এই সুযোগে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে হাওরপাড়ে তুলছেন কৃষকেরা। গতকাল দুপুরে সদর উপজেলার ঝাওয়ার হাওরে

মানুষের কথা

হাওরের কান্না থামুক

কিশোরগঞ্জসহ দেশের সব হাওর এলাকায় বৃষ্টি কমেছে। রোদ উঠেছে। চাষিরা আবার আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন। গত কয়েক দিন থেকে মনে পড়ছিল হাওরের কাইয়ুম মিয়া, আসিয়া বানুদের আশঙ্কার কথা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাঁধের হালহকিকত দেখতে হাওরে গেলে তাঁরা বলেছিলেন, ‘শিষের সময় চলি আয়। অহন জুদি ফার থাকি ঢল নামি তয় এই বান দি ফানি আটকান যাইত না, আমরা চিন্তাত আছি।’ (এখন যদি হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামে, অসমাপ্ত বাঁধ দিয়ে পানি ঠেকানো যাবে না। সময় পার হয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় আমরা খুব আতঙ্কে আছি।)

তাঁদের কথা গত ১৫ মার্চ প্রথম আলোতে লিখেছিলাম। (হাওরের বাঁধ: ‘আমরা আরম্ভ করি শেষ করি না...’) আশঙ্কা শেষ পর্যন্ত অক্ষরে অক্ষরে ফলতে বসেছিল। শনিবার (২ মে) এঁদের অনেকেই ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে যোগ দিতে আসবেন।

সংসদেও কথা উঠেছে। এর মধ্যেই সুনামগঞ্জ-৫ আসনের (ছাতক ও দোয়ারাবাজার) সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে হাওরের পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে বিবৃতি দিয়েছেন। হাওরবাসী আশা করছেন, অন্য সংসদ সদস্যরাও আওয়াজ তুলবেন।

সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস মানুষের মতো করে তৈরি করে মানুষের কাছে পৌঁছানো। দ্বিতীয় কঠিন কাজ হবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খুঁজে বের করা। জমির মালিকদের একটা হিসাব থাকলেও প্রকৃত চাষিদের কোনো তালিকা কেউ রাখে না। এসব বন্যায় জমির মালিকদের কোনো ক্ষতি হয় না। তাঁরা আগাম টাকা নিয়ে চাষিকে দেন চাষ করতে। চাষি ধারকর্জ করে ফসল ফলান।
সুনামগঞ্জের হাওরে চার দিন পর রোদ উঠেছে। এই সুযোগে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে এনে হাওরপারে তুলছেন কৃষকেরা। আজ বৃহস্পতিবার

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের সব কটি আসন (কিশোরগঞ্জের জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীও বিএনপির বিদ্রোহী) এবার ক্ষমতাসীন দলের কবজায়। হাওরের উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ-৪) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান সংসদে হাওরের ফসল রক্ষার টেকসই ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলবেন বলে কাইয়ুম মিয়া, আসিয়া বানুদের কথা দিয়েছেন।

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর উত্তর শুনে মনে হয়েছে তিনি বিষয়টি নিয়ে কিছুটা হোমওয়ার্ক করেছেন। তিনি সংসদকে জানিয়েছেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন আগেই। গত বুধবার সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেও তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সংসদে এসেছেন। হাওরের তিনটি জেলাসহ ময়মনসিংহের কিছু অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খুঁজে বের করে আগামী তিন মাস সহায়তা দেওয়া হবে।

মানুষ আসলে ত্রাণ নয়, টেকসই বাঁধের ব্যবস্থা দেখতে চাই। দেখতে চাই, যারা বাঁধ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি করে, তাদের বিচার হোক, যা কেউ কোনো দিন করেনি।

সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস মানুষের মতো করে তৈরি করে মানুষের কাছে পৌঁছানো। দ্বিতীয় কঠিন কাজ হবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খুঁজে বের করা। জমির মালিকদের একটা হিসাব থাকলেও প্রকৃত চাষিদের কোনো তালিকা কেউ রাখে না। এসব বন্যায় জমির মালিকদের কোনো ক্ষতি হয় না। তাঁরা আগাম টাকা নিয়ে চাষিকে দেন চাষ করতে। চাষি ধারকর্জ করে ফসল ফলান। তিন মাসের সহায়তা হোক আর এককালীন সহায়তা হোক, কোনোটাই ক্ষতিগ্রস্ত চাষির কাছে পৌঁছায় না। স্থানীয় সরকারের কার্যকর অনুপস্থিতিতে এখানে দলবাজদের দৌরাত্ম্য দেখা দিতে পারে।

মানুষ আসলে ত্রাণ নয়, টেকসই বাঁধের ব্যবস্থা দেখতে চাই। দেখতে চাই, যারা বাঁধ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি করে, তাদের বিচার হোক, যা কেউ কোনো দিন করেনি।

কোমরপানিতে নেমে ধান কাটছেন কয়েকজন কৃষক। আজ বৃহস্পতিবার সকালে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরে

কেমন হতে পারে নতুন বন্দোবস্ত

একসময় হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি সংস্থাগুলো যুক্ত ছিল, বিশেষ করে কেয়ার ও ব্র্যাক। তবে তারা সরাসরি বড় বাঁধ নির্মাণের ঠিকাদার ছিল না; বরং কমিউনিটি অংশগ্রহণভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আদলে কাজ করত।

১৯৯০-এর দশকে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো মনে করেছিল যে শুধু সরকারি সংস্থা দিয়ে হাওরের বাঁধ ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন। তাই কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়। তাদের কাজ ছিল:

•    স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করা

•    পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কমিটি গঠন

•    বাঁধের ছোটখাটো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ

•    কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া

•    স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা

অর্থাৎ তারা সামাজিক সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা করত, বড় প্রকৌশল কাজ নয়। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ অনেক আগ্রহ নিয়ে এ উদ্যোগে শামিল হয়ে মডেলটি তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখেন।

এই মডেলের উদ্দেশ্য ছিল:

•    স্থানীয় মানুষ যেন নিজেরাই বাঁধ রক্ষা করে

•    দুর্নীতি কমানো

•    দ্রুত মেরামত করা

•    কৃষকদের মালিকানাবোধ তৈরি করা

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হাওরের বাঁধ ব্যবস্থাপনায় আগে যে কমিউনিটিভিত্তিক মডেল চালু ছিল, তা বর্তমান পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) পদ্ধতির তুলনায় বেশি কার্যকর। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে:

১. প্রকৃত কমিউনিটির অংশগ্রহণ

কেয়ার–ব্র্যাক মডেলে প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যজীবীদের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকত। গ্রামের মানুষ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিত কোথায় বাঁধ দরকার। কখন মেরামত করতে হবে। কীভাবে কাজ হবে। ফলে মানুষ প্রকল্পটিকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে দেখত, শুধু সরকারি কাজ হিসেবে নয়।

২. সামাজিক জবাবদিহি

কমিউনিটি মডেলে গ্রামের ভেতরেই সামাজিক নজরদারি থাকত। কাজ খারাপ হলে স্থানীয় মানুষ সরাসরি প্রশ্ন করত। কমিটি গ্রামের মানুষের কাছে জবাবদিহি করত। বর্তমান পিআইসি পদ্ধতিতে অনেক সময় কমিটি স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী কয়েকজনের হাতে থাকে, ফলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়।

৩. স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার

হাওরের পানিপ্রবাহ, নদীর মুখ, বিল–খাল—এসব বিষয়ে স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকে। কেয়ার–ব্র্যাক মডেলে এই স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করা হতো।

ফলে কোথায় বাঁধ দিলে পানি আটকাবে, কোথায় দিলে ভেঙে যাবে, এসব সিদ্ধান্ত বেশি বাস্তবসম্মত হতো।

৪. ছোট, কিন্তু দ্রুত কাজ

কমিউনিটি মডেলে কাজগুলো সাধারণত ছোট ও দ্রুত হতো। দেরি কম হতো। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বাঁধ তৈরি হয়ে যেত। বর্তমান ব্যবস্থায় প্রশাসনিক অনুমোদন, বরাদ্দ, টেন্ডার বা পিআইসি গঠন—এসব কারণে সময় নষ্ট হয়।

৫. দুর্নীতির সুযোগ কম

কেয়ার–ব্র্যাক মডেলে সাধারণত ছোট বাজেট, স্থানীয় শ্রম, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হতো। ফলে বড় ঠিকাদার বা রাজনৈতিক প্রভাব কম থাকায় দুর্নীতির সুযোগ তুলনামূলক কম ছিল।

৬. দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ

কমিউনিটি মডেলে বাঁধ শুধু নির্মাণ নয়, রক্ষণাবেক্ষণও কমিউনিটির দায়িত্বে থাকত। মানুষ নিয়মিত ফাটল মেরামত, ঘাস লাগানো, দুর্বল জায়গা শক্ত করা—এ কাজগুলো করত।

বর্তমান পিআইসি পদ্ধতিতে অনেক সময় কাজ শেষ হলেই কমিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এটা হতে দেওয়া যাবে না।

  • গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক ও গবেষক