জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় গণমাধ্যম সম্মিলন। এ সময় উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। সংবাদপত্রের প্রকাশকদের সংগঠন নোয়াব ও সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে এ সম্মিলনের আয়োজন করে। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তন। ১৭ জানুয়ারি
জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় গণমাধ্যম সম্মিলন। এ সময় উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। সংবাদপত্রের প্রকাশকদের সংগঠন নোয়াব ও সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে এ সম্মিলনের আয়োজন করে। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তন। ১৭ জানুয়ারি

গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬

পেশার স্বার্থে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকা সময়ের দাবি

যেকোনো পরিস্থিতিতে স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন সংবাদপত্রের সম্পাদক, প্রকাশক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা। বক্তারা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের সামনে বড় বাধা হলো অনৈক্য। এ জন্য গণমাধ্যম হামলার শিকার হচ্ছে। গণমাধ্যমের ওপর এ আঘাত মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি।

‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’ থেকে এমন অভিমত উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে এ সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়। মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে এ সম্মিলনের আয়োজন করে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ। আয়োজকদের পক্ষ থেকে আগামী দিনে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে এ ধরনের আরও আয়োজন করার আশা প্রকাশ করা হয়।

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম সম্মিলনের শুরু হয়। এরপর গণমাধ্যমের ইতিহাস, স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আক্রমণ এবং সম্মিলনের উদ্দেশ্য নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রচার করা হয়।

নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদের সদস্য, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার, ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম, ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যবৃন্দ এবং ঢাকার বাইরে কর্মরত সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের সম্পাদক-প্রকাশকেরা ছাড়াও বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলাম লেখকেরা সম্মিলনে অংশ নেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

নোয়াবের সভাপতি এ কে আজাদ মায়ের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলা মধ্যযুগীয় বর্বরতা

সূচনা বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর

সূচনা বক্তব্যে প্রথম আলো-ডেইলি স্টার–এ হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। অগ্নিসংযোগের সময় ফায়ার সার্ভিসকে আসতে বাধা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর সভ্যতা বিকাশের এই পর্যায়ে, মধ্যযুগীয় কায়দায় কতগুলো সাংবাদিককে ওপরে রেখে, চারদিকে আগুন দিয়ে, দমকল বাহিনী আসলে বাধা দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, তাঁদের জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার মধ্যযুগীয় একটা বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ। এমন পরিস্থিতিতে সব গণমাধ্যম সমানভাবে হুমকির মুখে আছে। আজ এটার মধ্যে হয়েছে, কালকে আপনারটার মধ্যে হবে। পরশু আরেকটার মধ্যে হবে।’

এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নূরুল কবীর বলেন, সমাজে ভিন্নমত থাকবে, ভিন্ন কণ্ঠ থাকবে, ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষ কথা বলবে। এই বৈচিত্র্য জারি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যদি উচ্চকণ্ঠ না থাকে, তাহলে সমাজে অনেক ধরনের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ে।

নূরুল কবীর অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যও দেন। তিনি বলেন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে আসা সাংবাদিকেরা নিজেদের ঐক্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সাংবাদিকতার কথা বলেছেন। সাংবাদিকতা নিজে খুবই একটা রাজনৈতিক কাজ। তবে রাজনৈতিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক দলের দালালি এক জিনিস নয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে গণমাধ্যমকে বের করে নিয়ে আসার জন্য তৎপরতা চালাতে হবে। একই সঙ্গে ইতিহাস–সচেতনতা ও রাজনৈতিক সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।’

সাংবাদিকতার ভেতরকার পুনর্গঠন এবং নিজেদের ক্লেদ পরিষ্কার করার বিষয়ে অনুষ্ঠানে আলোচনাকে অগ্রগতি বলে উল্লেখ করেন নূরুল কবীর। তিনি বলেন, ‘আমরা ভবিষ্যতে আরও করণীয় নিয়ে এগোব। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরও কী কী সমাবেশ করা যায়, সে ধরনের পরিকল্পনাও করছি আমরা। গণমাধ্যমের আচরণবিধি কতটা সর্বব্যাপী হতে পারে, তা নিয়েও আমরা কাজ করছি। তবে ঐক্যের বিষয়টা যেন শূন্যগর্ভ কোনো স্লোগান হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্যই সারা দেশের পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমগুলো একত্র হয়েছে।’

পেশার স্বাধীনতা দরকার

সাংবাদিকতায় পেশাগত স্বাধীনতা, ব্যক্তিপূজা পরিহার ও সাংবাদিকদের বিকল্প দক্ষতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা শুধু চাকরি নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। এর স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।

বক্তব্য দেন প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান

সাংবাদিকদের ‘দালাল বলা’ হলে তাঁর দুঃখবোধ হয় জানিয়ে শফিক রেহমান বলেন, ‘যারা ছিল কয় দিন আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে, তারা হয়ে গেল সব এখন বিএনপির পক্ষে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, নাকি ম্যাজিক। এই ম্যাজিকে আপনি পড়বেন না। এতে আপনার সম্মান বাড়ছে না।’

সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রবীণ এই সম্পাদক বলেন, সাংবাদিকতা এখনো বাংলাদেশে পূর্ণ মর্যাদার পেশা হয়ে ওঠেনি। তবে এই মর্যাদা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সাংবাদিকদেরই। পত্রিকার জন্য তিনি একটি কমিটি গঠনের আহ্বান জানান, যা সম্পাদনা ও পেশাগত নীতিমালার মান নির্ধারণ করবে।

সমাজে ভিন্নমত থাকবে, ভিন্ন কণ্ঠ থাকবে, ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষ কথা বলবে। এই বৈচিত্র্য জারি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
নূরুল কবীর, সভাপতি, সম্পাদক পরিষদ

প্রথম আলো-ডেইলি স্টার–এ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শফিক রেহমান বলেন, ‘হিসাব করে দেখুন, হাদির মৃত্যুর ২০ মিনিটের মধ্যে অর্থাৎ আগেই টার্গেট ছিল যে যেকোনো উপায়ে হোক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে ধ্বংস করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদেশে দু-একজন পডকাস্ট বক্তা খুব খারাপ ভূমিকা রেখেছেন, এটা অন্যায়।’ অতীতে নয়া দিগন্ত, সংগ্রামসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামলার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকার ও বিচার বিভাগের সহায়ক স্বাধীন গণমাধ্যম

স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করলে, সত্যিকার অর্থে সেই উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি রাখলে সরকারই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, ‘সরকার, আপনি মনে রাখবেন, আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকেরা বলবে না ভয়ে এবং আপনার ব্যুরোক্রেসি বলবে না। আপনার ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি বলবে না। তারা সব সময় আপনাকে প্রশংসার মধ্যে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান, আপনাকে সত্য কথা বলে।’

বক্তব্য দেন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুনভাবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করার সময় এসেছে। একইভাবে সাংবাদিকতার একটা নতুন গণতান্ত্রিক, বলিষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ, এথিক্যাল জার্নালিজম করার একটা সময় এসেছে। সাংবাদিকতা পেশাকে আরও বেশি জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ডেইলি স্টার সম্পাদক আরও বলেন, সংবিধানে মাত্র দুটি পেশাকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে—স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন গণমাধ্যম। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, যেসব সমাজে সাংবাদিকতা শক্তিশালী ও স্বাধীন, সেসব সমাজে গণতন্ত্র সুদৃঢ় হয় এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা পরস্পরের পরিপূরক। আদালত অবমাননার মতো ক্ষমতা যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধে ব্যবহার না করা হয়।

সম্পাদকদের ভূমিকা প্রসঙ্গে মাহফুজ আনাম বলেন, সম্পাদকের নৈতিক দায় অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় বেশি। সংবাদমাধ্যমের মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অন্যান্য শিল্প খাতে বিনিয়োগের মতো মানসিকতা নিয়ে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করলে গণমাধ্যম কখনোই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না। সাংবাদিকতাকে তিনি ‘সামাজিক ডাক্তার’–এর সঙ্গে তুলনা করে আরও বলেন, সাংবাদিকেরা সমাজের সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা ও দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেন সমাজকে ভালোবাসার জায়গা থেকেই। ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করা হলে তা জনগণ গ্রহণ করবে না।

চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক মনে করেন, প্রকৃত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হলে তথ্যের শূন্যস্থান তৈরি হয়। আর এই শূন্যস্থান দখল করে নেয় ভুয়া সংবাদ; যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। এ পরিস্থিতি কখনো মঙ্গল বয়ে আনে না, কখনো আনেনি।

এম এ মালেক বলেন, ‘আমরা যাঁরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি, আমরা কারও বিরুদ্ধে নই। আমরা শুধু সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথটা মুক্ত রাখার আহ্বান জানাতে এসেছি। দায়িত্বশীল গণমাধ্যম যে ভয়হীন পরিবেশে কোনো বাধা ছাড়াই চলতে পারে, সেই আবেদন নিয়ে এসেছি।’

সাংবাদিকদের ঐক্য জরুরি

সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার ওপর জোর দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো সময়, যেকোনো বিরোধই ক্ষতিকারক।

এ সম্মিলনে পত্রিকা, অনলাইন, টেলিভিশন, সাংবাদিক ইউনিয়নের সবার এক জায়গায় একত্র হওয়ার বিষয়টিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, এটা বিগত ৫৫ বছর বা ১৫ বছরের মধ্যে একটা বড় অগ্রগতি, বড় ভাবনা, বড় চিন্তা। যে মতের, যে চিন্তার, যে ভাবনার, যে আদর্শের হোক না কেন, সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, সমঝোতা থাকতে হবে এবং সবার পাশে দাঁড়াতে হবে।

সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার ওপর জোর দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান

সবার প্রতি সবার সংহতি-সহানুভূতি জানানোর ওপর জোর দিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ‘এটা আমাদের ভাবার কোনো কারণ নেই যে আগামী সরকার, নির্বাচিত সরকার এলেই সবকিছু আমরা পেয়ে যাব। অতীতেও হয়নি, এখনো হবে না।’

অতীতের কাজ নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা করার সুযোগ আছে উল্লেখ করে প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘অনেক দেরিতে হলেও এই তর্কগুলো, বিতর্কগুলো অনেক বিলম্ব হলেও এখন হচ্ছে এবং কিছু পরিবর্তনের লক্ষ্য আমরা দেখছি। আমরা কিছু উদ্যোগও নিচ্ছি এবং তার মধ্যে আজকের সমাবেশও তার একটা প্রধান লক্ষ্য।’ তিনি বলেন, ঐক্য, সমঝোতা এবং সংহতি এই সময়ে আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

সাংবাদিকদের সামনে অনেক বাধাবিপত্তি আসবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে তা মোকাবিলার পরামর্শ দেন বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক করতোয়া পত্রিকার সম্পাদক মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় সরকার পরিবর্তন হলেও স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধার মুখোমুখি হয়েছে।

বর্তমানে স্বাধীন সাংবাদিকতা বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে মন্তব্য করে মোজাম্মেল হক বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য ঐক্যের খুব প্রয়োজন।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন দরকার

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ। গণমাধ্যমের ওপর হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল সংস্কার কমিশন থেকে। এই সুরক্ষা আইনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন সবাই। সম্পাদক পরিষদ, মালিকদের সংগঠন এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সবাই সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন।

বক্তব্য দেন সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ

এখনো আইনটি না হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে কামাল আহমেদ বলেন, সুপারিশ জমা দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যতজন সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত হয়েছেন; যেসব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আক্রমণের শিকার হয়েছে, এর দায়দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। কারণ, তারা অঙ্গীকার করেও সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেনি।

সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গে কামাল আহমেদ বলেন, গণতন্ত্রে গ্রেপ্তার কোনো ভাষা হতে পারে না। গণতন্ত্র হবে যুক্তির কথা, বিতর্কের কথা, আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা সমঝোতা বা একটা পথ খুঁজে নেওয়ার প্রশ্ন।

কোনো সরকারই স্বাধীন সাংবাদিকতা বা স্বাধীন গণমাধ্যম দেখতে চায় না বলে মন্তব্য করেন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) সভাপতি ও মাছরাঙা টিভির প্রধান সম্পাদক রেজোয়ানুল হক। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান সরকার, যাঁরা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা নতুন রাষ্ট্রের সংস্কারের কথা বলেন, তাঁরাও কাজটা করতে পারলেন না। তাঁরা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করলেন, কিন্তু সে সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট ফেলে রাখলেন, এটা নিয়ে কোনো কাজ করলেন না।

রেজোয়ানুল হক আরও বলেন, বিরোধী দলে থাকলে গণমাধ্যমকে বন্ধু মনে হয়। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে গণমাধ্যম শত্রু হয়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ঐক্যবদ্ধ না থাকা। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গণমাধ্যম সম্মিলনে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হাসান হাফিজ, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, দৈনিক সিলেট মিরর সম্পাদক আহমেদ নূর, রংপুরের যুগের আলো পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মমতাজ শিরীন ভরসা, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, আমার দেশ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, যশোরের দৈনিক কল্যাণ সম্পাদক একরাম উদ্দৌলা, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের মুনিমা সুলতানা প্রমুখ। এ ছাড়া ঢাকার বাইরের বিভিন্ন প্রেসক্লাবের নেতারাও বক্তব্য দেন।

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত গণমাধ্যম সম্মিলনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও মালিকেরা। গতকাল দুপুরে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে

সম্মিলনে সম্পাদকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংবাদ–এর আলতামাস কবির, দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস–এর শামসুল হক জাহিদ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড–এর ইনাম আহমেদ, বাংলাদেশ প্রতিদিন–এর আবু তাহের, ইউএনবির মাহফুজুর রহমান, চর্চার সোহরাব হাসান, সমকাল–এর শাহেদ মুহাম্মদ আলী, দেশ রূপান্তর–এর কামালউদ্দিন সবুজ, আজকের পত্রিকার কামরুল হাসান, ডেইলি সান–এর রেজাউল করিম, কালবেলার সন্তোষ শর্মা, ঢাকা স্ট্রিম–এর গোলাম ইফতেখার মাহমুদ, সুপ্রভাত বাংলাদেশ–এর রুশো মাহমুদ, বাংলাদেশ টাইমস–এর জসিম আহমেদ ও ইলিয়াস খান, যশোরের গ্রামের কাগজ–এর মবিনুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের যুগের চিন্তার মোরছালিন বাবলা।

বিশিষ্ট সাংবাদিকদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন এম এ আজিজ, সাজ্জাদ শরিফ, আনিসুল হক, আইয়ুব ভূঁইয়া, দৌলত আক্তার মালা, মামুন আব্দুল্লাহ, কাদির কল্লোল, উদিসা ইসলাম, রুমা পাল, মির্জা মেহেদি তমাল, শেখ সাবিহা আলম, তাসনীম খলিল, হারুনুর রশীদ, জুলহাস আলম, মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, কদরুদ্দিন শিশির।

গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও কলাম লেখকদের মধ্যে ছিলেন আলতাফ পারভেজ, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, মানজুর আলম মতিন, হাসিবুর রহমান। টেলিভিশন চ্যানেলের শীর্ষ সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল হাই সিদ্দিকী, জহিরুল আলম, ফাহিম আহমেদ, জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল প্রমুখ।