বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

সায়েন্টিফিক আমেরিকানের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব: কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেল

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান–স্বাস্থ্য–প্রযুক্তিবিষয়ক সায়েন্টিফিক আমেরিকান সাময়িকী একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি, কারণ তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশে হাসপাতাল ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা হামের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে লড়াই করছেন। টিকাদানের হার বাড়লেও হামের সংক্রমণ বেড়েছে। ২০০৫ সালের পর দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে এবারই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এতে শরীরে লালচে দাগ ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়। ফ্লুর মতো উপসর্গও হয়। তবে এই রোগ থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্ক ফুলে যাওয়ার মতো গুরুতর ও প্রাণঘাতী জটিলতা হতে পারে।

গত ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হামের সন্দেহভাজন রোগী ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন। এ সময়ে নিশ্চিত হাম বা উপসর্গে মারা গেছেন ১ হাজার ৪৪ জন। সংক্রমিতদের বেশির ভাগই দুই বছরের কম বয়সী শিশু, যারা টিকা পায়নি।

হামে শিশুর মৃত্যুতে স্বজনের আহাজারি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এ রোগের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। এসব এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য যোগাযোগবিষয়ক গবেষক এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের সাবেক যোগাযোগবিশেষজ্ঞ শাকিল ফয়জুল্লাহ বলেন, এই ভাইরাসগুলো কোনো ছাড় দেয় না। নিয়মিত টিকাদান প্রক্রিয়ায় যদি কোনো ছেদ পড়ে, তাহলে তারা দ্রুত আক্রমণ করবে। বাংলাদেশে সেটিই ঘটেছে।

এ বিষয়ে সায়েন্টিফিক আমেরিকান সাময়িকীর পক্ষ থেকে মন্তব্য চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।

হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির জন্য এনেছেন স্বজনেরা

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে মোট হামের রোগীর সংখ্যা ১০০–৩০০-এর মধ্যে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্যানডেমিক সেন্টারের পরিচালক জেনিফার নুজো বলেন, এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য রকমের বড় একটি প্রাদুর্ভাব। এর সঙ্গে টিকাদানের হার অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।

হামের এই প্রাদুর্ভাব বিশ্বজুড়ে রোগটির নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। অথচ টিকার মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ করা যায়। একসময় বিশ্বজুড়ে হাম নির্মূলের পথে ছিল।

সম্প্রতি কানাডা, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে হামের রোগী বেড়েছে। এসব দেশে একের পর এক প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত হামের ৩ হাজার ২৯৪ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। শুধু এ সপ্তাহেই পেনসিলভানিয়ায় হামে আক্রান্ত হয়ে চতুর্থ ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশু রোগী

তবে প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি এক নয়। কিন্তু এসব দেশের একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—টিকাদানের ঘাটতি। এ কারণে সামনে আরও ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে কি না, তা নিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টার ওরেনস্টেইন বলেন, হাম মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিতে শত শত মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। হামের টিকা খুবই নিরাপদ ও কার্যকর। টিকা নেওয়া শুধু নিজেকে সুরক্ষিত করে না, নিজের সমাজের অন্যদেরও সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

হাম ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কোনো জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হয়। এটিকে বলা হয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’। এই মাত্রার টিকাদান থাকলে রোগটি ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব হয়।

বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টার ওরেনস্টেইন বলেন, টিকাদানের এই হার এমন মানুষদেরও সুরক্ষা দেয়, যারা হামের দুটি প্রয়োজনীয় ডোজ নিতে পারে না। যেমন খুব কম বয়সী শিশু।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। তাই টিকাদানের হার সামান্য কমে গেলেও ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে তৈরি হয় ভয়াবহ পরিস্থিতি

স্বাস্থ্য যোগাযোগবিষয়ক গবেষক শাকিল ফয়জুল্লাহ বলেন, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ ছিল ‘টিকাদানের ক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ’। গত শতকের সত্তরের দশকে দেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়। এর ফলে সারা দেশে টিকা নেওয়ার হার বেড়ে যায়। বিভিন্ন কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনও নিয়মিত টিকা নেওয়া নিশ্চিত করতে সহায়তা করত।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের জনসংখ্যাবিষয়ক গবেষক আয়েশা মাহমুদ আগে বাংলাদেশে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ও সংক্রামক রোগের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন বাংলাদেশে বেড়ে উঠছিলাম, তখন মানুষ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আস্থা রাখত।’

আয়েশা মাহমুদ বলেন, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় ক্লিনিকের মাধ্যমে মানুষের কাছে স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং টিকাদান কর্মসূচি সবার কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী ব্যবস্থা রয়েছে।

হামে আক্রান্ত শিশুকে নেবুলাইজার দেওয়া হচ্ছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার হার ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার হার ছিল ৯৩ শতাংশ। দেশটি হামমুক্ত হওয়ার পথে এগোচ্ছিল। স্বাস্থ্য যোগাযোগবিষয়ক গবেষক শাকিল ফয়জুল্লাহ বলেন, কিন্তু এরপর বিভিন্ন জায়গায় ফাঁকফোকর তৈরি হয়।

অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের হার কমে যায়। এরপর জনস্বাস্থ্যকর্মীরা টিকাদানের হার বাড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ২০২৪ সালে টিকা সরবরাহের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে। টিকা কেনার দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়ায় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার পরিবর্তন আনে। এর ফলে টিকার মজুত কমে যেতে পারে বলে মনে করেন শাকিল ফয়জুল্লাহ।

শাকিল ফয়জুল্লাহ আরও বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) তহবিল কমে যাওয়াও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা এবং টিকা ও স্বাস্থ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।

হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা চলছে

২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকা নেওয়ার হার কমে ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। ইউনিসেফের একটি মূল্যায়নে বলা হয়, প্রায় ৪ লাখ শিশু প্রয়োজনীয় সব টিকা পায়নি। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকাই পায়নি।

টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়া, অপুষ্টি, শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত ভিড় ও অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকা স্বাস্থ্যব্যবস্থা—সবকিছু মিলেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গবেষণা করা যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির মহামারিবিশেষজ্ঞ উইলিয়াম মস বলেন, বিভিন্ন বিষয় মিলে একধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো আড়ালেই থাকে

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্যানডেমিক সেন্টারের পরিচালক জেনিফার নুজো বলেন, হামের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়।

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর উপায় হলো ব্যাপকভাবে টিকা দেওয়া। হামের টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার পর শরীরে দ্রুত রোগপ্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে এই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

গত এপ্রিলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বড় পরিসরে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেন। এ কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর থেকে হামের প্রাদুর্ভাব কমার কিছু লক্ষণ দেখা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই উন্নতি দেশের সব এলাকায় সমান না–ও হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির মহামারিবিশেষজ্ঞ উইলিয়াম মস বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হলো, জাতীয় পর্যায়ের টিকাদানের হিসাব অনেক সময় বাস্তব চিত্রটি পুরোপুরি তুলে ধরে না। কোনো দেশের সামগ্রিক টিকাদানের হার যথেষ্ট বেশি হলেও সেখানে টিকা না নেওয়া মানুষের বড় বড় গোষ্ঠী থাকতে পারে। এসব এলাকায় হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন উইলিয়াম মস।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের জনসংখ্যাবিষয়ক গবেষক আয়েশা মাহমুদ বলেন, বড় ধরনের মহামারি ঠেকাতে দুর্গম এলাকায় থাকা এবং কম টিকা নেওয়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে টিকাদান কর্মসূচি চালানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই মানুষের মধ্যে হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। তবে এ ঘাটতির কারণ একেবারেই আলাদা।

এ প্রসঙ্গে শাকিল ফয়জুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে এর কারণ টিকা সরবরাহ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যাঘাত। আর যুক্তরাষ্ট্রে এর কারণ নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কম টিকা নেওয়া এবং টিকা নিতে অস্বীকৃতি বা টিকা নিয়ে দ্বিধা।

জেনিফার নুজো বলেন, এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে যে কেউ হামের টিকা নিতে চাইলে তা নিতে পারেন। বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তা টিকাবিরোধিতার কারণে হয়নি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টিকা সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন জেনিফার নুজো ও উইলিয়াম মস।