পাহাড়ধসে মরণকাল যেন শুরু হলো আবার। জলবায়ু সংকটের মতো এই বিপর্যয়ও মানুষের তৈরি, কাঠামোগত হত্যা। রাষ্ট্র ও নয়া উদারবাদী ব্যবস্থা—কেউ এর দায় এড়াতে পারে না। পাহাড়ধসের মূল কারণ নৃশংসভাবে পাহাড় কেটে পাহাড়ের শ্রেণি পরিবর্তন। কী কারণে, কীভাবে, কে বা কারা এই অন্যায় করে চলেছে, তা গোপন নয়।
২০০৭ সালে লিখেছিলাম, ‘পাহাড় কাটা না থামালে মৃত্যুর মিছিল থামবে না’। ২০ বছর ধরে রাষ্ট্র পাহাড়ের বিজ্ঞান অস্বীকার করে চলেছে। দেশজুড়ে পাহাড় কেটে ছেনে চুরমার করা হয়েছে। পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র ও প্রকৃতিকে লন্ডভন্ড করা হয়েছে। পাহাড়–জীবনের সঙ্গে অনভ্যস্ত সমতলের গরিব নিম্নবর্গকে জবরদস্তি করে পাহাড়ে তুলে জনমিতির রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পাহাড়ি মাটির শরীর চেনে না যে গাছ—সেগুন, তামাক বা অ্যাকাশিয়ার বাণিজ্যিক বাগান করা হয়েছে। পাহাড়ের সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনের আধ্যাত্মিক, প্রতিবেশগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও উৎপাদনমূলক লোকায়ত সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। পাহাড় ক্রমেই হয়ে উঠেছে ‘মাটির স্তূপ’ কিংবা অবকাঠামো বাণিজ্যের ‘স্থল’। পাহাড় নিয়ে এই প্রবল পুঁজিবাদী চিন্তাই একের পর এক ধসিয়ে দিচ্ছে পাহাড়। নিখোঁজ হচ্ছে জীবন ও স্মৃতি।
চলতি বর্ষায় গত চার দিনে বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ২৯ জন নিহত হয়েছেন। দীঘিনালা-সাজেক সড়কের কবাখালীতে পানি উঠেছে, নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে। সাজেকে আটকা পড়েছে পর্যটক। কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ। চট্টগ্রাম নগরী ডুবেছে। দুর্ঘটনা এড়াতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সব ঝরনা এলাকায় সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ।
কিন্তু এসব তো কোনো প্রতিবেশগত সমাধান নয়। পাহাড়ধসের মূল কারণগুলো বন্ধ না করে রেলপথ উঁচু, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া পাহাড় বা মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবে না। যেসব কারণে আজ পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠল এবং যারা করল, তাদের জনতার কাঠগড়ায় আনা জরুরি।
পাহাড়ধসের করুণ স্মৃতি
দেশের ইতিহাসে নির্মম পাহাড়ধস ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। অবিরাম বর্ষণে চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকার লেবুবাগান, কুসুমবাগ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং বান্দরবানে নিহত হন ১৩০ জনের বেশি।
২০০৮ সালের ৬ জুলাই কক্সবাজারে পাহাড়ধসে চারজন মারা যান। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণকাজে নিয়োজিত সেনাসদস্যদেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছে তখন। এ বছর মোট ১৪ জন মারা যান। ২০০৯ সালে মারা যান ৩ জন। ২০১০ সালের ১৫ জুন ভোরে কক্সবাজার ও বান্দরবানে পাহাড়ধসে প্রায় অর্ধশত মানুষ নিহত হন। ২০১১ সোলে ১৭ জন, ২০১২ সালে ২৮ জন, ২০১৩ সালে ২ জন, ২০১৪ সালে ১ জন এবং ২০১৫ সালে ৬ জন মারা যান। কেবল চট্টগ্রাম বিভাগ নয়, ২০০৮ সালের ২০ জুলাই পশ্চিম খাসি এলাকার কালাপাহাড় ধসে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্ত ক্যাম্পসহ আশপাশের ধানিজমি ও বসতবাড়ি সব পাহাড়ি বালুর নিচে চাপা পড়ে।
২০১৬ সালে পাহাড়ধস না হলেও ২০১৭ সালের ১২ জুন মধ্যরাত থেকে ১৩ জুন ভোরে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রায় ১৩৭ জন মানুষ নিহত হন। দেখা গেছে, প্রতিটি পাহাড়ধস ঘটছে মূলত অভিবাসিত বাঙালিদের এলাকায় এবং মারা যাচ্ছেন বাঙালিরাই। কিন্তু ২০১৭ সালের জুনে পাহাড়ধসে রাঙামাটিতে চাকমা ও বান্দরবানে খিয়াং জনগোষ্ঠীরও মৃত্যু ঘটেছে। কারণ, তাঁরাও নিজেদের গ্রাম থেকে এসে শহর এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ কাটা পাহাড়ে বসবাস করছিলেন।
পাহাড়শুমারি অনুযায়ী দেশের সর্বমোট ২৮২টি পাহাড়ের ভেতর বেশি পাহাড় সিলেট বিভাগে—৩৭টি এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড রিজে ৩৬টি। বান্দরবানের রুমার সাকা হাফং বা মোদক টং, ডুমলং বা মুখরা থুথাই কিংবা কেওক্রাডং ও তাজিংডং দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এসব পাহাড় কিন্তু ধসে পড়েনি।
পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনায় কোনো পরিবারই ন্যায়বিচার পায়নি। বরং প্রতিষ্ঠিত বয়ান হলো যাঁরা মারা যান, তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ কাটা পাহাড় এলাকায় বসবাস করেন। এমনকি এবারও পুলিশ জানাচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আনা কঠিন। তাহলে প্রশ্ন হলো, পাহাড় কেটে কারা ঝুঁকিপূর্ণ করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসের অনুমোদন কীভাবে হয়?
পাহাড়ের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক
সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, শেরপুর, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, নেত্রকোনা ও জামালপুরে পাহাড়ি টিলা থাকলেও পাহাড় বলতে আমরা কেবল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বুঝি। ড. সাইদুর আর চৌধুরী চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়গুলোকে ১৮টি পাহাড়শ্রেণি বা রিজে ভাগ করেন। সেটি ধরে দেশের সব পাহাড় নিয়ে ২০২২ সালে জিয়াউল হক প্রকাশ করেন ‘পাহাড়শুমারি’। পাহাড়শুমারি অনুযায়ী দেশের সর্বমোট ২৮২টি পাহাড়ের ভেতর বেশি পাহাড় সিলেট বিভাগে—৩৭টি এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড রিজে ৩৬টি। বান্দরবানের রুমার সাকা হাফং বা মোদক টং, ডুমলং বা মুখরা থুথাই কিংবা কেওক্রাডং ও তাজিংডং দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এসব পাহাড় কিন্তু ধসে পড়েনি।
ধসে না পড়া পাহাড়গুলোর নাম ‘বাংলা’ ভাষায় নয়। বরং দেখা গেছে, যেসব পাহাড় ক্রমাগতভাবে ধসে পড়েছে, সেসব পাহাড় কেটে বাঙালিরা নতুন বাংলা নাম দিয়েছে।
তাহলে পাহাড়ের আদি স্থাননামগুলো কী প্রমাণ করে? প্রমাণ করে এখানে পাহাড় ঘিরে সভ্যতা বিস্তৃত হয়েছে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর যে তালিকা তৈরি করে, তাতে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি রেঞ্জের ২৯টি পাহাড়ের মধ্যে ৫টি রেঞ্জের ৯টি পাহাড়ের নামই পাংখোয়া ভাষার। রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার একটি পাহাড়ের নাম থাংনাং। থাংনাং এক পাহাড়ি পোকা। বাঘাইছড়ির সাজেকের বড় পাহাড়ের নাম সাজেক থ্লাং, পাংখোয়া ভাষায় এর অর্থ অপূর্ব সুন্দর পাহাড়।
বান্দরবানের রেমেক্রী-প্রাংসা ইউনিয়নের তজিংডং পাহাড়ের নাম মারমা ভাষার শব্দ। মারমা ভাষায় ত-জিং-টং মানে সবুজ পাহাড়। বম ও মিজো ভাষাতে এর নাম চিং চির ময় ক্লাং, বাঙালিরা একবার এর নাম দিয়েছিল ‘বিজয়’। ক্যাক-ক্রো-টং (ক্রেওক্রাডং) পাহাড়টির নামও মারমা ভাষার, মানে হলো পাহাড়ের শীর্ষদেশ। বম ও মিজো ভাষাতে এর নাম ক্রেওক্রক্লাং।
দেখা গেছে, ৪৫ ডিগ্রির বেশি কোণে পাহাড় কেটে বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদন ধ্বংস করা হয়। ‘উন্নয়নের’ নামে খুন হয় পাহাড়। একটানা অতিবর্ষণে তাই ধসে পড়ে রুগ্ণ পাহাড়।
পাহাড়ের সঙ্গে আদিবাসী জাতিসত্তার জটিল আধ্যাত্মিক ও প্রতিবেশগত সম্পর্ক আছে। জুমচাষ বা ঘর তৈরির আগে পাহাড়ের কাছে অনুমতি চেয়ে কৃত্য পালন করা হয়। কোন পাহাড়ে কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না—এসব নিয়ে প্রতিটি সমাজেই আছে নানা সামাজিক বিধিনিষেধ। চাকমারা ‘নামাচুলগাত’ বৈশিষ্ট্যের পাহাড়ে জুম আবাদ করে না। মানে যে পাহাড়ে গর্ত থাকে এবং বৃষ্টির পানি তলদেশ পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে। এমনকি দুই পাহাড়ের ভেতর মানুষের মতো দেখতে বা যে পাহাড়ে বানর ও গুইসাপের মৃতদেহ পাওয়া যায়, সেখানেও জুম আবাদ নিষিদ্ধ।
বহু ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সমাজের কাছে পাহাড় এক পবিত্র আত্মা। পাহাড় ঘিরেই গড়ে উঠেছে বহু লোককথা, গীতরঙ্গ ও লোকায়ত বিজ্ঞান। চিম্বুক পাহাড়ে যখন ম্যারিয়ট হোটেল বানাতে চায় কিংবা সরই পাহাড়ে যখন লামা রাবার কোম্পানি পাহাড় ধ্বংস করে, তখন ম্রো জনগণ জীবন বাজি রেখে দাঁড়ান। ম্রোদের প্রতিবাদ জানানোর কারণ ছিল পাহাড়ের প্রতি তাঁদের বিশ্বাস। পাহাড়ি ঝরনায় পবিত্র পাথর থাকে, এসব পাথর সরালে সমাজে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি নেমে আসে।
পাহাড়ের ডাক শুনবে কে
যাঁরা পাহাড় কাটেন কিংবা যাঁরা সমতল থেকে এসে কাটা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করেন, তাঁদের কাছে পাহাড়ের লোকায়ত বিজ্ঞান জানা নেই। বাইরের মানুষ পাহাড়কে দেখে মাটির ঢিবি, খনি বা পর্যটন ব্যবসার স্পট হিসেবে। আর পাহাড়ধসের মৌলিক দ্বন্দ্বটা এখানেই। দেখা গেছে, ৪৫ ডিগ্রির বেশি কোণে পাহাড় কেটে বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদন ধ্বংস করা হয়। ‘উন্নয়নের’ নামে খুন হয় পাহাড়। একটানা অতিবর্ষণে তাই ধসে পড়ে রুগ্ণ পাহাড়।
পাহাড় সুরক্ষায় স্থানীয়ভাবে আইনি তৎপরতা সক্রিয় নয়। এমনকি পাহাড় বাঁচাতে গিয়ে একজন বন কর্মকর্তা নিহত হয়েছিলেন।
হুট করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে নয়া বসতি উচ্ছেদ কোনো সমাধান নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের জনজীবন বাঁচাতে বছরব্যাপী দুর্যোগ প্রস্তুতি দরকার। দেশব্যাপী পাহাড়-টিলা সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় সক্রিয়তা জরুরি। পাহাড়ের সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনের লোকায়ত সম্পর্ক ও ব্যবস্থাপনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হতে পারে। পাহাড় সুরক্ষায় দেশে কোনো নীতি নেই। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া পাহাড়-টিলা কাটা নিষিদ্ধ। পাহাড়ের মৃত্যুমিছিল থামাতে হলে পাহাড়ের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির ন্যায্যতা প্রশ্নে ‘জাতীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ জরুরি।
* পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক।