
বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে আজ বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনে ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে বিচারিক কার্যক্রম চলেছে। তবে সপ্তাহের প্রতিটি কার্যদিবসেই শারীরিক উপস্থিতিতে আদালতের কার্যক্রম চালু রাখার দাবি এবং ভার্চ্যুয়াল কোর্ট প্রদানের বিরুদ্ধে কালো পতাকা নিয়ে মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন আইনজীবীদের একাংশ।
ওই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারের যে জায়গাটা, যে প্রক্রিয়াটা, সেটা স্থবির হয়ে পড়েছে দাবি করেছেন ওই আইনজীবীরা। সপ্তাহের প্রতিটি কার্যদিবসে সশরীর বিচার কার্যক্রম চালুর দাবি দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তাঁরা। ঘোষণা অনুসারে, যদি আগামী সপ্তাহের মধ্যে নিয়মিত আদালত চালু না হয়, সে ক্ষেত্রে ২৮ এপ্রিল (আগামী মঙ্গলবার) দুপুরে কালো পতাকাসহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন আইনজীবীরা।
এর আগে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় সপ্তাহের প্রতি বুধ ও বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে এবং সপ্তাহের অন্যান্য কার্যদিবসে শারীরিক উপস্থিতিতে আদালত পরিচালিত হবে বলে ২০ এপ্রিল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই নির্দেশনা ২২ এপ্রিল (বুধবার) থেকে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে ২২ (গতকাল বুধবার) ও ২৩ এপ্রিল (আজ বৃহস্পতিবার) ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে বিচারিক কার্যক্রম চলে।
এর আগে সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসেই আইনজীবীদের শারীরিক উপস্থিতিতে আদালতের কার্যক্রম চালু রাখার দাবি জানিয়ে ২১ এপ্রিল মানববন্ধন করেন আইনজীবীদের একাংশ। তাঁদের ব্যানারে লেখা ছিল ‘আয়োজনে: সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্যবৃন্দ’। এরপর ঘোষণা অনুসারে তাঁরা ২২ এপ্রিল (গতকাল বুধবার) বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন তাঁরা। ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে আজ দুপুরে কালো পতাকা ও অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন এই আইনজীবীরা।
আগের ঘোষণা অনুসারে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে আজ দুপুরে কালো পতাকা নিয়ে আইনজীবীরা সমবেত হন। সেখানে অবস্থা্নের পর মিছিল নিয়ে সমিতি ভবন প্রদক্ষিণ করেন। এরপর কালো পতকাসহ মিছিল নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে গিয়ে ব্রিফিং করেন তাঁরা। এরপর স্লোগানসহ মিছিল নিয়ে সমিতি ভবনে এসে শেষ হয়। এ সময় আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব, মোকছেদুল ইসলাম, শাহ আহমেদ বাদল, মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান, এম আশরাফুল ইসলাম, আনিসুর রহমান রায়হান, মাকসুদ উল্লাহ, আশরাফ রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ‘সমিতির সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক গতকাল গিয়েছিলেন (প্রধান বিচারপতির কাছে)। প্রত্যাশা করেছিলাম, প্রধান বিচারপতি তাঁর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। কিন্তু যেহেতু করেননি, সে কারণে কালো পতাকা মিছিল অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।’
আইনজীবী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান বলেন, ‘গত দুই দিনের পরীক্ষান্তে যেটা দেখেছি… তেল ও বিদ্যুতের যে কথা বলা হয়েছে, কোনোটাই সেভ হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ গাড়িতে ভরে যাচ্ছে। বিচারপ্রার্থী মানুষেরাও নিয়মিত আসছেন। আমরা আইনজীবীরাও আসছি।…একটা দেশের বিচার বিভাগ হচ্ছে তার আইনের শাসন, মানবাধিকার, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জায়গা। সুতরাং এটা তেল–গ্যাস বা অন্যান্য সংকটকে অতিক্রম করেও এটি চালু রাখতে হবে।’
নিষ্পত্তির তুলনামূলক সংখ্যা তুলে ধরে মাহবুবুর রহমান খান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারের যে জায়গাটা, বিচারের যে প্রক্রিয়াটা স্থবির হয়ে পড়েছে। সংকুচিত হয়ে পড়েছে।…আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ করব পরীক্ষামূলক যে দুই দিন অতিক্রান্ত হয়েছে, এই পরীক্ষান্তে এটা বুঝতে পেরেছি যে এটা আসলে কাজ করছে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দাবি থাকবে, আগামী সপ্তাহ থেকে ওই সিদ্ধান্ত রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) করে নিয়মিত আদালত শুরু করবেন।’
যদি আগামী সপ্তাহের মধ্যে নিয়মিত আদালত চালু না হয়, সে ক্ষেত্রে তারা ২৮ এপ্রিল (আগামী মঙ্গলবার) বেলা একটায় কালো পতাকাসহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন বলে ঘোষণা দেন আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান।
ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশাধিকারের বিষয়টিও আসে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর) মামলাগুলোর বিচার হচ্ছে উল্লেখ করে আইনজীবী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের বিচারও আমরা লাইভ প্রচার হতে দেখেছি। সুতরাং সেটি যদি লাইভ প্রচারিত হতে পারে, তাহলে এই আদালত প্রাঙ্গণ বা আদালতের ভেতরে, এজলাসের ভেতরে সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীদের যাওয়ায় প্রতিবন্ধকতা কোথায়, তা আমাদের কাছেও বোধগম্য নয়।’
এর আগে আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ‘বুধবারও বলেছি, সাংবাদিকেরা যেকোনো আদালতে প্রবেশ করবেন, শুনানি শুনবেন এবং সেটা জাতিকে জানাবেন। এটা না হলে, সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বিচার বিভাগের। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ন্যায়বিচারপ্রার্থী জনগণের। বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করছি, অবিলম্বে সাংবাদিকেরা যেন আপিল বিভাগসহ সব আদালতে আগের মতো ফ্রি অ্যাকসেস পান।’
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আজ বৃহস্পতিবার ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে আপিল বিভাগে (চেম্বার আদালতসহ) ১৮৯টি মামলার শুনানি ও ৯৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগে ১ হাজার ২৭১টি মামলার শুনানি ও ৫০১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। উভয় বিভাগে সর্বমোট ১ হাজার ৪৬০টি মামলার শুনানি ও ৫৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।