
গ্রামের মেঠো রাস্তার পাশে সাবমার্সিবল পাম্পের সাহায্যে তোলা পানি একটি ট্যাংকে সংরক্ষণ করা আছে। সেখান থেকে সরবরাহ করা পানি সংরক্ষণ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন সুমিতা রানী। তাঁর বাড়ি নওগাঁর পোরশা উপজেলার ছাওড় ইউনিয়নের দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামে।
পানি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন জিজ্ঞেস করলে সুমিতা হাত উঁচু করে প্রায় ২০০ মিটার দূরের একটি পাড়ার দিকে ইশারা করলেন। বললেন, ‘ওই পাড়ায় যাব। হামাগের পাড়াত খাবার পানি পাওয়া যায় না। তাই প্রতিদিন এই ট্যাপ থেকে পানি লিয়ে য্যায়ে খাই। প্রতিদিন তিন-চার বালতি পানি লিয়ে যাওয়া লাগে। এত দূর থ্যাকে পানি লিয়ে য্যাতে কষ্ট হয়। কিন্তু করার কিছু নাই।’
নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বিশেষ করে জেলার পোরশা, নিয়ামতপুর, সাপাহার ও পত্নীতলার উঁচু এলাকায় পানির স্তর কমে যাওয়ার হার উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি প্রধানত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত সেচের জন্য গভীর নলকূপের ব্যবহার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জলাধার ও খালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এক-দেড় দশক আগেও অল্প গভীরতাতেই পানির স্তর পাওয়া যেত। কিন্তু এখন অনেক গভীরে নলকূপ বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। নলকূপে পানি উঠছে না। ফলে প্রতিদিন দূরের গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে স্থানীয় লোকজনকে। এতে সময়, শ্রম ও অর্থ—তিন দিক থেকেই চাপে পড়ছে সাধারণ মানুষ।
এ অবস্থা শুধু নওগাঁরই নয়, উত্তরের জেলা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জেরও অনেক এলাকার। পরিস্থিতি বিবেচনা করে গত বছরের ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৩ হাজার ৫৯৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ, উচ্চ এবং মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার চারটি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নকে অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে পোরশা উপজেলার চারটি ইউনিয়ন রয়েছে।
পানির সংকট কতটা
গবেষকেরা বলছেন, দেশের উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলার পানির স্তর নামছেই। বর্ষা মৌসুমেও এ স্তর স্বাভাবিক অবস্থায় আসছে না রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ‘সাসটেইনিং গ্রাউন্ড ওয়াটার ইরিগেশন ফর ফুড সিকিউরিটি ইন দ্য নর্থইস্ট রিজিয়ন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রথম ধাপের গবেষণা হয়েছে ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় ও শেষ ধাপ হয়েছে ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত। গবেষণায় নেতৃত্ব দেয় অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (সিএসআইআরও)।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের গবেষণায় দেখা যায়, দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নামছে ঢাকা নগর, গাজীপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চলে। পানি কমলেও যে হারে পানি উঠছে, তার পুনর্ভরণ বা রিচার্জ হচ্ছে না।
সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণায় কী হবে
বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩–এর আলোকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে আদেশ জারি হয়। এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয় গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর। উত্তরের তিন জেলা ছাড়াও চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি মৌজাও পানি–সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে পড়েছে। এসব এলাকাকে বিভিন্ন স্তরে সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিত করা হয় আগামী ১০ বছর পর্যন্ত।
সংকটাপন্ন এলাকায় কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ থাকবে। এখন যেসব নলকূপ আছে সেগুলোর মাধ্যমে খাওয়ার পানি সরবরাহ অব্যাহত রেখে সেচকাজের ফসল বৈচিত্র্যকরণ করে পর্যায়ক্রমে দুই বছরের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পানি উত্তোলন কমাতে কৃষকদের উৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না। খাল, বিল, পুকুর, নদী বা কোনো জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এবং জলাশয়গুলো ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। কোনো জলাধারের সমগ্র পানি আহরণ করে নিঃশেষ করা যাবে না। ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন করতে পারে এমন কাজ করা যাবে না। জলাশয়, লেক, জলাভূমিতে বসতবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তরল ও কঠিন অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা বা দূষণ করা যাবে না। বেশি পানিনির্ভর ফসল উৎপাদন নিরুৎসাহিত বা সীমিত করতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে পানিসাশ্রয়ী ফসলের আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে।
পানির কষ্ট সবারই
১৫ মার্চ পোরশা উপজেলার ছাওড় ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, শীতলডাঙ্গা ও হাড়ভাংগা গ্রামে সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রাম তিনটিতে ছয়-সাত বছর ধরে হাতে চাপা নলকূপে (টিউবওয়েল) কোনো পানি ওঠে না। গভীর নলকূপ বসিয়ে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হয় গ্রামের বাসিন্দাদের। কোথাও কোথাও ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার দূরে গিয়ে গভীর নলকূপে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
হাড়ভাংগা গ্রামের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, চৈত্র-বৈশাখ মাসে গভীর নলকূপ ও সাবমার্সিবল পাম্প থেকেও পানি ওঠে না। তখন গ্রামের এক পাড়ার লোক আরেক পাড়ায় গিয়ে পানি সংগ্রহ করে আনে। চৈত্র-বৈশাখে গ্রামের প্রায় সব পুকুরের পানি শুকিয়ে যায়। গোসল কিংবা
থালাবাসন ধোয়ার মতো পানি থাকে না পুকুরে।
শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা জব্বার মণ্ডল বলেন, ‘পানির জন্য হামাগের খুব কষ্ট। পানির কষ্টের কারণে হামাগের গ্রামে অন্য এলাকার মানুষেরা ছেলেমেয়েক বিয়া দিতে চায় না।’
সরকারের বার্তা মাঠে পৌঁছায়নি
পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাঁরা মনে করেন, ঘোষণা দেওয়া এবং সেইমতো কাজ পরিচালনার মধ্যে ফারাক আছে। ইতিমধ্যে গরম পড়েছে। শুকনা মৌসুম এসে গেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সরকারের এসব নির্দেশনা ও করণীয় সম্পর্কে কোনো বার্তা যায়নি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশিক আহমেদ বলেন, ‘সংকটাপন্ন এলাকার কথা জেনেছি। তবে সরকারের কোনো নির্দেশনা আছে কি না, তা খোঁজ করে জানতে হবে। সম্ভবত আসেনি।’
চট্টগ্রামের পটিয়ার ইউএনও ফারহানুর রহমান কোনো নির্দেশনা আসেনি বলে জানান। সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার পর করণীয় নিয়ে কোনো নির্দেশনা না পাওয়ার কথা জানান নওগাঁর সাপাহারের ইউএনও রোমানা রিয়াজও।
মাঠে বার্তা না যাওয়ার বিষয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমরা এসব বিষয় নিয়ে ঈদের পর বসব। সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে আরও বিস্তারিত কাজ করা যায় কি না, তা–ও বিবেচনা করা হবে।’