ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ২৫তম সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তার বক্তব্য দেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী। ২ ফেব্রুয়ারি
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ২৫তম সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তার বক্তব্য দেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী। ২ ফেব্রুয়ারি

যখন ব্যর্থতা আসবে, তাকে স্বাগত জানান: তপন চৌধুরী

‘আমি একবার নয়, বহুবার ব্যর্থ হয়েছি। এতবার ব্যর্থ হয়েছি যে নিজের আত্মবিশ্বাস নিয়েই প্রশ্ন তুলতে হয়েছিল। আজ পেছনে তাকিয়ে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমার কিছু বড় ব্যর্থতাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।’

কথাগুলো বলেছেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী। আজ সোমবার সকালে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ২৫তম সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর আফতাবনগর খেলার মাঠে এ আয়োজন ছিল।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম। স্বাগত বক্তব্য দেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক শামস রহমান। আরও বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।

সমাবর্তন বক্তা হিসেবে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী বলেন, ‘একসময় আমি বিশ্বাস করতাম, জীবন একটি ছকবাঁধা সূত্র মেনে চলে। শিক্ষা, ক্যারিয়ার, সাফল্য, সুখ—সব ধাপে ধাপে আসে। কিন্তু আসলে জীবন কোনো পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইড মেনে চলে না। বিশেষ করে ব্যর্থতা কখনোই সিনেমাটিক নয়। সেখানে কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নেই, স্লো মোশন নেই, অনুপ্রেরণামূলক সাবটাইটেলও নেই। কিন্তু সেই মুহূর্তগুলো আমাকে এমন শিক্ষা দিয়েছে, যা কোনো মানুষই দিতে পারত না।’

এ সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তপন চৌধুরী বলেন, ‘আজকের পর যদি নিজেকে অনিশ্চিত বা একটু হারিয়ে যাওয়া মনে হয়, আতঙ্কিত হবেন না। আপনি পিছিয়ে যাননি, ভাঙেননি। আপনি কেবল শিখছেন।’

‘আমাদের সমস্যা সমাধানকারী প্রয়োজন’

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ২৫তম সমাবর্তনে মঞ্চে অতিথিরা। ২ ফেব্রুয়ারি

তপন চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষা কেবল একটি সুবিধা নয়; এটি একটি দায়িত্ব। আগামী বছরগুলোতে আপনার ডিগ্রি নীরবে আপনাদের কিছু অস্বস্তিকর কিন্তু অপরিহার্য প্রশ্ন করবে। আপনি আপনার জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করলেন? কাকে সেবা দিলেন? কোন সমস্যার সমাধান করলেন?’

দেশের জন্য শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং সমস্যা সমাধানকারী ও নৈতিক পেশাজীবী প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তপন চৌধুরী। তিনি বলেন, আমাদের দরকার এমন মানুষ, যারা কেবল অনলাইনে অভিযোগ না করে কাজে নামেন। একটি পোস্ট শেয়ার করা আর একটি সমস্যা সমাধান করা এক নয়। সাফল্য কেবল চাকরির পদবি, বেতন বা কত দ্রুত লিংকডইন আপডেট করলেন—তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত সাফল্য নিহিত থাকে প্রভাবের মধ্যে।

এ সময় সদ্য স্নাতক পাস করাদের সামনে পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এই বিশ্ব প্রযুক্তিতে নতুনভাবে গড়ে উঠছে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ আছে, আর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও রয়েছে। ফলে ক্যারিয়ার আর সরলরৈখিক ও স্থিতিশীল নেই। এখনকার প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক। তারা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়; তারা সিঙ্গাপুর, লন্ডন, বেইজিং, মুম্বাই ও সিলিকন ভ্যালিতেও আছে। কিন্তু এতে ভয় পাওয়া যাবে না, বরং অনুপ্রাণিত হতে হবে।

সমাবর্তনে যোগ দেওয়া শিক্ষার্থীদের একাংশ। ২ ফেব্রুয়ারি

নিজের প্রতিষ্ঠান স্কয়ারের উদাহরণ টেনে তপন চৌধুরী বলেন, স্কয়ার আন্তর্জাতিকভাবে সাফল্য পেয়েছে বিশ্বমানের চিন্তা নিয়ে, আর বাংলাদেশে গভীরভাবে প্রোথিত থেকে। আজ স্কয়ারের বার্ষিক আয় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি বাংলাদেশের জিডিপির শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। স্কয়ারের কর্মীদের মাথাপিছু আয় ২৫ হাজার ডলারের বেশি। এটি দেশের জাতীয় গড় আয়ের প্রায় ১০ গুণ। জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৪ শতাংশ অবদান স্কয়ারের। এসব সংখ্যার বাইরেও প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নৈতিকতা, নীতিমালা, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রতি অঙ্গীকার।

বক্তব্যের শেষে শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তপন চৌধুরী। এগুলো হচ্ছে— ব্যর্থতা, নৈতিকতা ও উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘জীবনের শুরুতেই যদি একটি বিষয়ের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করতে চান, সেটি হলো ব্যর্থতা। ব্যর্থতা চরিত্র গড়ে। ব্যর্থতা বিচারবুদ্ধি শাণিত করে। ব্যর্থতা বিনয় শেখায়। যখন ব্যর্থতা আসবে, তাকে স্বাগত জানান। দ্রুত শিখুন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যান। ব্যর্থতা সাময়িক; অনুশোচনা অনেক বেশি স্থায়ী। শর্টকাট যত সহজই দেখাক, নৈতিক থাকুন। আর উদ্দেশ্যে অটল থাকুন।’

অন্য অতিথিরা যা বললেন

কৃতী এক শিক্ষার্থীকে মেডেল পরিয়ে দেন পিএসসি চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম । ২ ফেব্রুয়ারি

অনুষ্ঠানে পিএসসি চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম রাষ্ট্রপতি ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলরের প্রতিনিধি হিসেবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিগ্রি প্রদান করেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, কোনো সংকীর্ণ বা একক বিশ্বাসে আবদ্ধ না থেকে নিজেদের ভূমিকা সর্বজনীন করে তোলাই হবে লক্ষ্য। বাংলাদেশের ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। অর্জিত জ্ঞান ও পরিচয়কে বিশ্বদরবারে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় তোমরাই হবে অগ্রসৈনিক।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় সর্বদা মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে সকলকে সাথে নিয়ে স্বচ্ছতার সাথে চলার চেস্টা করেছে। বিগত বছরে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা এখান থেকে যে দক্ষতা, নৈতিকতা, মানবিকতার শিক্ষা অর্জন করেছেন; তা দিয়ে আগামী দিনে একটি বৈষম্যহীন সমতার সমাজ গড়তে তাঁরা অবদান রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শিক্ষার্থীদের স্বস্তির জায়গা থেকে বের হয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণের আহ্বান জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শামস রহমান। তিনি বলেন, সঠিক লক্ষ্যে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে এগোতে হবে। দক্ষ ও উৎপাদনশীল হতে হবে। সেই সঙ্গে নৈতিকতা ও মানবিকতা দিয়ে সুনাগরিক হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।