
তখনো বুঝতে পারিনি কোথায় যাচ্ছি। ওয়াটসনস বে দেখতে যাচ্ছি, শুধু এটাই জানি। সিডনি শহর ঘোরাতে ঘোরাতে আমাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছিল বাল্যবন্ধু সাজিদুল ইসলাম। ৩০ বছর ধরে সিডনিতে থাকে সাজিদ, এই শহর তাঁর কাছে হাতের তালুর মতোই চেনা। সাজিদ যেহেতু নিয়ে যাচ্ছে, ভালো কোনো জায়গায়ই হবে।
ওয়াটসনস বের পাথুরে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সোজা সামনে তাকালে তাসমান সাগর অসীমে মিশে যায়। সাজিদ বলল, ওপারেই নাকি নিউজিল্যান্ড! বলা সহজ; কিন্তু এক দেশে দাঁড়িয়ে সাগরের ওপারে দৃষ্টি রেখে আরেক দেশ দেখা দুরবিন দিয়েও অত সহজ নয়। আমিও ওখানে দাঁড়িয়ে শুধু কল্পনাই করতে পারলাম—ওপারে নিউজিল্যান্ড!
মানুষ এখনো ‘দ্য গ্যাপ’–এ যান। তবে আত্মহত্যা করতে নয়; যান ডন রিচি আর বিপন্ন মানুষকে নতুন জীবন দেওয়ার কীর্তি শুনতে। স্থানীয় গাইড দর্শনার্থীদের সেসব গল্প শোনাতে শোনাতে নিজেই যেন হয়ে ওঠেন একজন ‘ডন রিচি’!
ওয়াটসনস বের বিখ্যাত স্থান ‘দ্য গ্যাপ’ দেখা তখনো বাকি। গাছগাছালির ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা ওয়াকওয়ে আর কিছুটা উঁচু–নিচু পাথুরে পথ পেরিয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে রীতিমতো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
প্রথমত ভয়ে। পাথুরে ক্লিফ (গিরিখাত) ঠিক ওই জায়গায় একেবারে খাড়া নেমে গেছে প্রমত্ত সমুদ্রে। নিচে প্রবল ঢেউ এসে ধাক্কা দিচ্ছে পাথরের গায়ে। জায়গাটা উঁচু তারের বেষ্টনী দিয়ে সুরক্ষিত, তবু কিনারে গিয়ে নিচে তাকালে ভয় না লেগে উপায় নেই। একবার নিচে পড়লে বেঁচে থাকা দূরে থাক, দেহটাও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।
গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার আরেকটি কারণ দ্য গ্যাপের ইতিহাস। সাজিদ সবে কাহিনিটা বলতে শুরু করেছে, তার মধ্যেই দ্য গ্যাপের দিকে যেতে যেতে চোখে পড়ল নিচু লম্বা দেয়ালের মতো একটি বেদি। স্টিলের হরফে তার ওপর ইংরেজিতে লেখা, ‘Always remember the power of the simple smile, a helping hand, a listening ear, and a kind word’, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা এ রকম, ‘সব সময় সামান্য একটু হাসি, একটি সাহায্যের হাত, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার মানসিকতা এবং একটি সদয় শব্দের শক্তিকে মনে রাখবেন।’
কথাটা বলেছিলেন ডন রিচি নামের এক ব্যক্তি, যিনি পেশায় ছিলেন একজন জীবনবিমা কর্মী। লেখার শেষে জীবনকালের সঙ্গে তাঁর অন্য পরিচয়ও দেওয়া আছে; যে পরিচিতির জন্য ডন রিচিকে সবাই চেনেন, যে পরিচিতির জন্য বিখ্যাত দ্য গ্যাপ।
ডন রিচির বলা কথাটা পড়ার সময় স্থানীয় এক গাইড কাছে এসে জানতে চাইলেন, ‘তুমি কি ডন রিচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাও?’ ‘অবশ্যই চাই’ বললে তিনি উৎসাহ নিয়ে শোনাতে লাগলেন মানুষের নতুন জীবন পাওয়ার গল্প, বিপন্নদের যা দিতেন ডন রিচি।
ডন রিচির জন্ম ১৯২৬ সালের ৯ জুন, মৃত্যু ২০১২ সালের ১৩ মে। গাইডের কাছ থেকেই শোনা, জীবদ্দশায় অন্তত ১৮০ জনকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে বেঁচে থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০০৬ সালে তাঁকে ‘Medal of the Order of Australia (OAM)’ পদকে ভূষিত করে। ২০১১ সালে তিনি পান ‘অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার লোকাল হিরো’ পুরস্কার। নিজের কীর্তির কারণেই ডন রিচির আরেক পরিচয় ‘অ্যাঞ্জেল অব দ্য গ্যাপ’ বা গ্যাপের দেবদূত।
ডন রিচি ‘দেবদূত’ হয়ে উঠেছিলেন আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষ আর তাঁদের পরিবারের কাছে। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে যাঁরা জীবনটাকেই শেষ করে দিতে চাইতেন, দুঃখকষ্টের কাছে হেরে যাওয়া সেসব মানুষ একসময় সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে চলে আসতেন দ্য গ্যাপে।
জীবদ্দশায় অন্তত ১৮০ জনকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে বেঁচে থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন ডন রিচি। তিনি ‘দেবদূত’ হয়ে উঠেছিলেন আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষ আর তাঁদের পরিবারের কাছে।
বেলেপাথরের এই ক্লিফ থেকে সমুদ্রের পানি সময়ভেদে প্রায় ৪০ থেকে ১০০ মিটার (১৩০ থেকে ৩০০ ফুট) নিচে থাকে, সেই পানির নিচেই শক্ত পাথর। জীবনকে শেষ করে দিতে চাইলে এর চেয়ে ‘নির্মম জায়গা’ আর কী আছে! দ্য গ্যাপ তাই দিনে দিনে কুখ্যাত হয়ে ওঠে সিডনির ‘সুইসাইড স্পট’ হিসেবে।
ওয়াটসনস বে–তে ডন রিচির বাড়ি দ্য গ্যাপের কাছেই। মানুষকে আত্মহত্যা থেকে ফেরানোর দায়িত্বটা তিনি নিজেই কাঁধে তুলে নেন। প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিপন্ন মানুষদের দিকে নজর রাখতেন। আশপাশে কাউকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে কিংবা যদি বুঝতে পারতেন কেউ আত্মহত্যার কথা ভাবছেন, ডন তাঁর কাছে গিয়ে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করতেন, ‘আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?’
এরপর মানুষটির কথা শুনতেন, তাঁকে জীবনের কথা বলতেন। প্রয়োজনে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাঁকে চা খাওয়াতেন। কখনো কখনো শুধু পাশে বসে মানুষটির সহমর্মী হতেন। সামান্য এই মানবিকতা দিয়ে বহু মানুষকে ডন রিচি ফিরিয়ে আনেন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। সিডনির মানুষ সে কারণেই ভালোবেসে তাঁর নাম দিয়েছিল, ‘দ্য অ্যাঞ্জেল অব দ্য গ্যাপ’।
ডন রিচি আজ নেই; কিন্তু দ্য গ্যাপে এখন আত্মহত্যা ঠেকাতে আছে উঁচু নিরাপত্তা বেষ্টনী, ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি ক্যামেরা, রাতের বেলায় কেউ গেলে জ্বলে ওঠে স্বয়ংক্রিয় আলো, কারও বিপদ দেখলে সাহায্য চাইতে যোগাযোগের জন্য আছে ইমার্জেন্সি ফোন বুথ। আত্মহত্যার হারও এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। ‘সুইসাইড স্পট’ থেকে মানুষকে নতুন জীবন দেওয়ার সেই জায়গাটিতে হয়েছে ডন রিচি উদ্যান।
মানুষ এখনো দ্য গ্যাপে যান। তবে আত্মহত্যা করতে নয়; যান ডন রিচির গল্প আর বিপন্ন মানুষকে নতুন জীবন দেওয়ার কীর্তি শুনতে। স্থানীয় গাইড দর্শনার্থীদের সেসব গল্প শোনাতে শোনাতে নিজেই যেন হয়ে ওঠেন একজন ‘ডন রিচি’!
সেদিন ডন রিচি উদ্যান থেকে বের হওয়ার পথে আরেকবারে দ্য গ্যাপে গিয়ে দাঁড়িয়ে যা মনে হয়েছিল, তা মনে হলো আজ ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে’ও। হতাশায় নুয়ে পড়া কাউকে বাঁচাতে খুব বড় কোনো আয়োজন কি আসলেই লাগে! লাগে তো শুধু একটু সময়, একটু মনোযোগ আর একটি প্রশ্ন—আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি?