
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, রাখাইনে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য জবাবদিহি এবং রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে টেকসই প্রত্যাবাসন একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে বলে বাংলাদেশ মনে করে।
আজ বৃহস্পতিবার ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে ‘দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট: একটি সমন্বিত পদ্ধতির সন্ধান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আইসিজে ও আইসিসিতে চলমান বিচারপ্রক্রিয়াকে আমরা পুরোপুরি সমর্থন করি। কারণ, বাংলাদেশ মনে করে, রাখাইনের জন্য ন্যায়বিচার এবং রাখাইনে প্রত্যাবাসন একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।’
হুমায়ুন কবির বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বহুপক্ষীয় প্রচেষ্টার পাশাপাশি আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক কূটনীতির প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ‘বাস্তবসম্মত ও টেকসই পথ খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় চীন, আসিয়ান, জাতিসংঘ ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।’
মাঠপর্যায়ের জটিল পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা বর্তমানে মিয়ানমার রাষ্ট্রের প্রশাসনের বাইরে এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে তাতমাদাও ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সংঘাত অঞ্চলটিকে প্রত্যাবাসনের উপযোগী স্থানের পরিবর্তে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
এগুলো আমাদের কৌশলের পাদটীকা নয়, বরং এর কেন্দ্রীয় প্রতিবন্ধকতা বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তবে চ্যালেঞ্জগুলো কঠিন হলেও তা অতিক্রম করা অসম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের সমাধান খুঁজতে প্রয়োজনীয় ধৈর্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অধীনে ১৯৭৮ সালে এবং আবার বেগম খালেদা জিয়ার অধীনে ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিহাস ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে প্রত্যাবাসন সম্ভব। তিনি বলেন, এটি ‘যদি’র প্রশ্ন নয়। এটি ‘কীভাবে’ এবং ‘কত দ্রুত’—সেটির প্রশ্ন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে দেশের কূটনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একই সঙ্গে একটি মানবিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের উপস্থিতির কারণে মানবিক উদ্বেগের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়ছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। কক্সবাজারের জনগণের নিরাপত্তা ও সুযোগ নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। আমরা দুটির মধ্যে কোনো একটি বেছে নেব না।’ তিনি বলেন, সরকারের নীতি হলো উন্মুক্ত-সময়ের মানবিক ব্যবস্থাপনা থেকে প্রত্যাবাসন-সম্পর্কিত কর্মসূচির দিকে রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, যাতে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি স্থায়ী না হয়ে যায়।
মানবিক সাড়া ও দায়ভার ভাগাভাগির বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, অর্থায়নের ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ ও পূর্বানুমানযোগ্য আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগির জন্য চাপ অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, বাস্তবে যা একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব, তার ভার কোনো একক দেশের বহন করা উচিত নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের আওতায় কঠোরভাবে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই দ্রুত সম্পন্ন করতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিতে চায় বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বহুপক্ষীয় প্রচেষ্টার পরিপূরক হিসেবে ঢাকা আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা চায় এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক, মানবিক এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব বিকল্প উন্মুক্ত রাখতে চায়, যাতে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়ার জন্য দেশ প্রস্তুত থাকে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হতাশার পরিবর্তে নতুন দৃঢ় সংকল্প নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানান এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের অতীত সাফল্যের কথা স্মরণ করেন।
সম্মেলনে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, সম্মেলনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এ এস এম আলী আশরাফ, প্রতিনিধিদল, শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী, ফরেন সার্ভিস একাডেমির প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।