আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ এবং মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা শীর্ষক বই দুটির প্রকাশনা উৎসবে (বাঁ থেকে) সাজ্জাদ শরিফ, তাহমিদাল জামি, ওয়াকিল আহমদ, মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক, এ কে এম শাহনাওয়াজ, মাসউদ ইমরান ও জীশান কিংশুক হক। প্রথম আলো কার্যালয়ে। ১০ জানুয়ারি
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ এবং মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা শীর্ষক বই দুটির প্রকাশনা উৎসবে (বাঁ থেকে) সাজ্জাদ শরিফ, তাহমিদাল জামি, ওয়াকিল আহমদ, মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক, এ কে এম শাহনাওয়াজ, মাসউদ ইমরান ও জীশান কিংশুক হক। প্রথম আলো কার্যালয়ে। ১০ জানুয়ারি

প্রথমার দুটি বইয়ের প্রকাশনা

ইতিহাসের আলোয় স্বদেশের মুখ

ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির মনোজ্ঞ আলোচনায় সমুজ্জ্বল হলো স্বদেশের মুখ। বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ ও প্রাচীন শিলালিপি নিয়ে প্রথমা প্রকাশন দুটি আকরগ্রন্থ প্রকাশ করেছে সম্প্রতি। আজ শনিবার ছুটির দিন বিকেলে বই দুটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ইতিহাসবিদেরা তুলে ধরলেন দেশের গৌরবময় ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের বিবিধ প্রসঙ্গ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রগতি ভবনের দশম তলায় প্রথম আলোর সভাকক্ষে এই আয়োজন করেছিল প্রথমা প্রকাশন। বই দুটো হলো স্বনামখ্যাত শৌখিন পুরাতাত্ত্বিক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ। অপরটি বঙ্গীয় শিল্পকলাচর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের অতিথি অধ্যাপক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা।

শিলালিপি বইটি নিয়ে আলোচনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ওয়াকিল আহমেদ বলেন, বাংলার মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের ইতিহাস মূলত আরবি-ফারসি ভাষায় লিখিত। নির্ভুলভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে এই শিলালিপিগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইউসুফ সিদ্দিক বাংলা ভাষায় শিলালিপিগুলো অনুবাদ করে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে তার অর্থ পৌঁছে দিয়েছেন। এসব শিলালিপিতে ঐতিহাসিক তথ্য–উপাত্তের পাশাপাশি অনেক গৌরবময় ঐতিহ্যের বিষয়ও রয়েছে। লেখক দীর্ঘদিন থেকে এসব শিলালিপি নিয়ে নিবিড় অনুসন্ধান ও পরিশ্রমসাধ্য গবেষণা করছেন। অন্ধকার থেকে আলোর জগতে নিয়ে এসেছেন।

ওয়াকিল আহমেদ বলেন, লেখক শিলালিপিগুলোর অনুবাদের পাশাপাশি এর বিষয়বস্তু, লেখার ভাষা, লিপির নান্দনিকতা এবং সেই সময়ের সামাজিক অবস্থান, ভৌগোলিক পরিবেশ নিয়েও গভীর তাৎপর্যময় আলোচনা করেছেন। সে কারণে এই গ্রন্থ একটি মূল্যবান আকরগ্রন্থ হয়ে উঠেছে। প্রথমা প্রকাশন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করায় তিনি ধন্যবাদ জানান।

শিলালিপি বইটির সম্পাদক ও তরুণ গবেষক তাহমিদাল জামি বলেন, ‘আমাদের দেশের ইতিহাসচর্চায় ঔপনিবেশিক আমলের আগের সময়ের ইতিহাসের অনেক ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে। আরবি-ফারসি শিলালিপি নিয়ে এই বইটি ইতিহাসের প্রাথমিক সূত্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে। লেখক কেবল বর্ণনামূলক অনুবাদ করেননি। তাঁর কাজ বিশ্লেষণমূলক। বিশ্বের বিভিন্ন ধরনের শিলালিপির সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনাও এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। ফলে তাঁর কাজটি হয়েছে বহুমাত্রিক।’

শিলালিপি বইটি নিয়ে আলোচনা করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ওয়াকিল আহমেদ। ১০ জানুয়ারি

লেখক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক তাঁর আলোচনায় পাওয়ার পয়েন্টে শিলালিপিগুলো বড় পর্দায় তুলে ধরে সেগুলোর প্রাপ্তিস্থান, সময়, ভাষা, অঙ্কনশৈলী, তৎকালীন সমাজ–সংস্কৃতি, জনজীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতার দিকগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘অনেক শিলালিপিতেই দেখা যাচ্ছে তখন সমাজে ছিল সহাবস্থান ও সমন্বয়মুখিতা। বিভিন্ন ধর্ম ও জনজাতির মানুষ সম্প্রীতির সঙ্গে একত্রে বসবাস করতেন। এই শিলালিপিগুলো এই বিষয়টি আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। সে কারণে ইতিহাসের এই অনন্য উপাদানগুলো এখনো আমাদের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক।’

বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ বইটি আগে অন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এবার প্রথমা থেকে প্রকাশিত হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজের সম্পাদনায়। তিনি বলেন, তাঁরা যখন ইতিহাসের ছাত্র, তখন দেশের প্রত্নসম্পদ নিয়ে জানার মতো তথ্য ছিল কম, বইও ছিল না। ফলে জানার সুযোগও বিশেষ ছিল না। সেই সময় আ ক ম যাকারিয়ার এই বইটি যেন একটা আলোর ঝলকের মতো এসেছিল তাঁদের কাছে। বইটি ইতিহাসের ছাত্র-শিক্ষকদের হাতে হাতে পৌঁছে যায়। বইটি তখন তিনি ছাত্র হিসেবে পড়েছেন পরীক্ষায় পাসের জন্য। পরবর্তী সময়ে শিক্ষক হিসেবে বইটি ছাত্রদের পড়িয়েছেন। এখনো দেশের কোনো স্থানের প্রত্নসম্পদের সম্পর্কে খোঁজ নিতে গেলে বা নতুন কোনো প্রত্নস্থানের সন্ধান করতে গেলে এই বইয়ের সাহায্য নিতে হয়। বইটি বাংলাদেশের প্রত্ন গবেষণার ও পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশকের মতো।

অধ্যাপক শাহনাওয়াজ বলেন, বইটি এতই নিখুঁতভাবে লিখিত যে সম্পাদক হিসেবে বলতে গেলে তিনি বিশেষ কিছু করার সুযোগই পাননি। বইটিতে আ ক ম যাকারিয়া প্রত্ননিদর্শনের বিবরণের পাশাপাশি নৃতত্ত্ব, ভূগোল, ধর্ম, সংস্কৃতি এসব বিষয়েও গভীর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। বইটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলা এবং ঐতিহাসিক সময় অনুসারে বিষয়বস্তু সাজিয়েছেন। ফলে আগ্রহী পাঠক তাঁর নিজের জেলায় কোথায় কী আছে, তা সহজেই এই বই থেকে জানতে পারবেন। এবার প্রথমা থেকে বইটি আরও সুদৃশ্যভাবে প্রকাশিত হলো। এটা খুবই আনন্দের বিষয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাসউদ ইমরান বলেন, আ ক ম যাকারিয়া শিক্ষক না হয়েও তিনি দেশের প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের সবার শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন। এটি এমন একটি বই, যা ব্যক্তিগতভাবে করা খুবই কঠিন। সরকারি চাকরির সূত্রে দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করার যে সুযোগ তাঁর হয়েছিল, সে সুযোগ তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন এই গ্রন্থের জন্য। তিনি ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক’ এর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশের প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের অনুসন্ধান করেছেন।

অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট লেখক, কবি, ইতিহাসের অনুসন্ধানী ও আগ্রহী পাঠকেরা উপস্থিত ছিলেন। ১০ জানুয়ারি

বই দুটির প্রকাশনা সহযোগী ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চিফ কমিউনিকেশন অফিসার জীশান কিংশুক হক বলেন, ইতিহাসকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন টেকসই হয় না। প্রাচীন ইটপাথরে থাকা নির্বাক ইতিহাস এই বই দুটিতে বাঙ্‌ময় হয়ে উঠেছে। এই প্রকাশনার সহযোগিতায় যুক্ত থেকে ইউসিবি খুবই আনন্দিত।

অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট লেখক, কবি, ইতিহাসের অনুসন্ধানী ও আগ্রহী পাঠকেরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের স্বাগত জানিয়ে সঞ্চালক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ সূচনা বক্তব্যে বলেন, এই বই দুটির স্থায়ী মূল্য রয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ বইটি ইতিমধ্যে একটি আকরগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। শিলালিপি গ্রন্থটিও আকরগ্রন্থ হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ইতিহাস আলোকবর্তিকার মতো। সেই আলোয় রাঙা আয়োজনটি আরও উষ্ণ হয়ে উঠেছিল বই দুটি নিয়ে আলোচনা আর পরে চায়ের পেয়ালা হাতে শ্রোতা-আলোচকদের পারস্পরিক আলাপচারিতায়।