রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল কেয়ার কনক্লেভ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা। (বাঁ থেকে) শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, আইএলওর বাংলাদেশে নিযুক্ত পরিচালক (কান্ট্রি ডিরেক্টর) ম্যাক্স টুনন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল কেয়ার কনক্লেভ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা। (বাঁ থেকে) শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, আইএলওর বাংলাদেশে নিযুক্ত পরিচালক (কান্ট্রি ডিরেক্টর) ম্যাক্স টুনন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

যত্ন-সেবায় বিনিয়োগে ৯ বছরে ৭০ লাখ কর্মসংস্থান হতে পারে

জাতীয়ভাবে সেবা ও যত্ন খাত (কেয়ার সেক্টর) নিয়ে নীতিমালা তৈরি করে বিনিয়োগ করলে ব্যাপক হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিশুযত্ন, মাতৃদুগ্ধ দান, প্রাথমিক শৈশব যত্ন ও দীর্ঘমেয়াদি যত্ন এই চারটি নীতিতে বিনিয়োগ করলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশে ৭০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল কেয়ার কনক্লেভ ২০২৬’ বা জাতীয় যত্ন–সেবা সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউএন উইমেন ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

সম্মেলনে বক্তারা একটি শক্তিশালী নীতিমালা কাঠামোর মাধ্যমে জাতীয় যত্ন-সেবা অর্থনীতির উন্নয়নের ওপর জোর দেন। আইএলওর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০৩৫ সালের মধ্যে সম্ভাব্য ওই কর্মসংস্থানের মধ্যে ২০ লাখ সরাসরি শিশুযত্ন খাতে এবং ৩০ লাখ দীর্ঘমেয়াদি যত্ন খাতে যুক্ত হবে। বাকি ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এই খাতের বাইরে, তবে সেটা হবে পরোক্ষভাবে।

এই চার নীতি বা ‘কেয়ার পলিসি’ প্যাকেজে বিনিয়োগ করা হলে কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কাজ শুরু করতে হবে ঘর থেকে। ছেলেমেয়েদের শেখাতে হবে বাড়ির কাজ প্রত্যেকের।

এদিকে ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী নারী ও কিশোরীরা পুরুষদের তুলনায় প্রতিদিন আড়াই গুণের বেশি সময় বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। গৃহস্থালি ও যত্ন-সেবামূলক বিনা পারিশ্রমিকের কাজে নারীরা পুরুষদের তুলনায় সাত গুণের বেশি সময় ব্যয় করেন।

সম্মেলনে নীতি ও কৌশলগত অগ্রাধিকার–বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে পরিবারের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব মূলত নারীর। এই ধারণা বদলানো প্রয়োজন। যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব শুধু নারী বা পুরুষের নয়, এটি যৌথ দায়িত্ব। তাই নারী-পুরুষের সমান দায়িত্ব নিশ্চিত করতে মানসিকতার পাশাপাশি নীতিগত পরিবর্তন আনা জরুরি।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী বা গৃহস্থালি সব ধরনের যত্নই কেয়ার সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। এই খাতে মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারলে এই খাত থেকে বিদেশেও কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। এই খাতে বিনিয়োগের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেল সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।’

সম্মেলনে যত্ন–সেবা খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত নীতিমালা তৈরির বিষয়ে একমত পোষণ করেন উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা।

বাড়িতে অবৈতনিক শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, বাড়িতে নারীরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের যত্নের জন্য শ্রম দিয়ে থাকেন। এই নারীরা যদি বাড়িতে যত্ন না দিতেন, তাহলে অনেক নারীর বাইরে কর্মসংস্থানে যোগ দেওয়া সম্ভব হতো না। এই নারীদের শ্রমকে স্বীকৃতি দিতে, তাঁদের মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু করেছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কাজ শুরু করতে হবে ঘর থেকে। ছেলেমেয়েদের শেখাতে হবে বাড়ির কাজ প্রত্যেকের।

এ পর্বটি সঞ্চালনা করেন আইএলওর বাংলাদেশে নিযুক্ত পরিচালক (কান্ট্রি ডিরেক্টর) ম্যাক্স টুনন।

সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্যে ইউএন উইমেনের এদেশীয় প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং বলেন, যত্ন ও সেবাব্যবস্থায় বিনিয়োগ নারী, সমাজ ও অর্থনীতির জন্য ‘ত্রিমুখী লাভ’ বয়ে আনে। এতে নারীদের সময়ের চাপ কমে ও তাঁরা শ্রমবাজারে বেশি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এর ফলে মানব উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচনে দীর্ঘমেয়াদি সুফল আসে। তিনি আরও বলেন, যত্ন-সেবা অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং এর ফলে আয় ও রাজস্ব বাড়বে।

দিনব্যাপী এই সম্মেলনে মোট পাঁচটি অধিবেশন ছিল। দ্বিতীয় অধিবেশনে উচ্চপর্যায়ের এক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন সমাজকল্যাণসচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান নাজনীন কাউসার চৌধুরী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শবনম মোস্তারী এবং অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. তারিকুল ইসলাম খান।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা এবং এডিবির প্রধান সামাজিক উন্নয়ন কর্মকর্তা (জেন্ডার) নাশিবা সেলিম। এ অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন গীতাঞ্জলি সিং।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এডিবির নাশিবা সেলিম ও আইএলওর জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়কারী অ্যানি ড্রং।