সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ
সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ

‘মধুচন্দ্রিমা’ শেষ করে দ্রুত শৃঙ্খলা ফেরান, নতুন সরকারকে বললেন সংখ্যালঘু নেতারা

নতুন সরকারকে ‘মধুচন্দ্রিমা’ শেষ করে দ্রুত দেশের আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা। তাঁরা বলেছেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, বসে থাকার সময় নেই, যুদ্ধে নামতে হবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন সব জায়গায় দেখতে চাই।’

‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে’ আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে নেতারা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ সংখ্যালঘু ঐক্যমোর্চাভুক্ত সংগঠনগুলো যৌথভাবে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে।

নির্বাচনের পর ভোলার তজুমদ্দিনে ধর্মীয় উৎসবে যাওয়া এক নারীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ, চট্টগ্রামের আকাশ দাস, বগুড়ার সুনীল বাঁশফোড়, কক্সবাজারের ব্যবসায়ী গণেশ পাল, বগুড়ার শিক্ষক চয়ন রাজভর, যশোরের অরুণ অধিকারী, ময়মনসিংহের চাল ব্যবসায়ী সুশেন চন্দ্র, গাইবান্ধার অমিতাভ চন্দ্রকে হত্যাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা মন্দির-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা, লোকজনকে অত্যাচার-নিপীড়নের প্রতিবাদ ও এসব ঘটনায় বিচারের দাবিতে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, সরকারের বয়স মাত্র এক মাস। কেউ এটিকে ‘মধুচন্দ্রিমা’ বলছেন। সনাতনী সমাজে নতুন সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরবর্তী এমন সময়কে ‘কালবেলা’ও বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, সরকার কি এখনো মধুচন্দ্রিমায় আছে, নাকি বাস্তব কাজের সময় চলছে? তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দ্রুত কাজ করার কথা বলেছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছেন—এমন উদ্যোগ সব ক্ষেত্রেই দেখতে চান।

সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে ‘রেইনবো নেশন’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন, যেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সমান অধিকার থাকবে। তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে নির্যাতিতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি অনুদান বিতরণে অনিয়ম না হওয়ার বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুব্রত চৌধুরী বলেন, গত ৫৪ বছরে অনেক ভালো উদ্যোগ তদারকির অভাবে নষ্ট হয়েছে। অতীতের হত্যাকাণ্ডে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকারও সমালোচনা করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে তিনি ভালো সূচনার প্রত্যাশা করেন।

সুব্রত চৌধুরী অভিযোগ করেন, সংসদে জাতীয় সংগীতের সময় কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী দাঁড়ায়নি, যা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে সুব্রত চৌধুরী বলেন, সরকার জিরো টলারেন্সের কথা বললেও দেশে এখনো মবক্রেসি চলছে। তিনি অভিযোগ করেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, হত্যাকাণ্ড ও মন্দিরে বোমা হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, নির্বাচন হওয়ার এক মাসের মধ্যেই সারা দেশে অর্ধশত সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে হত্যা, প্রতিমা ও মন্দিরে হামলা, জমি দখল, আদিবাসীদের সম্পত্তি লুটপাট ও উচ্ছেদের মতো ঘটনা রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

মণীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার মানবিক ও সম–অধিকারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ভোলায় কীর্তন থেকে এক তরুণীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক মাসে আটটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, নির্বাচনের এক মাস না যেতেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে রাজপথে নামা অত্যন্ত দুঃখজনক। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের কাছে অতীতের গ্লানি দূর করে নতুন অধ্যায় শুরুর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

বাসুদেব ধর বলেন, গত এক মাসে অর্ধশতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলার সংজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।

মানববন্ধন সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের নির্বাহী মহাসচিব পলাশ কান্তি দে। এতে সংহতি বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব সুব্রত হাজরা, জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক এম কে রায় প্রমুখ। মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল হয়।