
শিশুর বয়সসীমা ৬ মাস থেকে ৫ বছর।
ভিটামিন ‘এ’র লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ২৬ লাখ।
হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৮০ লাখ।
১৮% শিশু এখনো হামের টিকা পায়নি।
হাম–রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রায় ত্রুটি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একটি হিসাব বলছে, প্রায় ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে দেশব্যাপী টিকা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছে, প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার চার মাস পরও হাম নিয়ন্ত্রণে না আসার এটি একটি কারণ।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এ বছরের মার্চের শুরুতে। গতকাল শনিবারও তিনটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ নিয়ে হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭৫৩।
হাম নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকার এপ্রিল মাস থেকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে হাম–রুবেলার টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে এ কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে দেশের সব উপজেলা, জেলা, শহর–নগর ও সিটি করপোরেশনে জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হয়। ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে।
তবে ২৮ জুন দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার পর একই বয়সী শিশুদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি বড় আকার ধারণ করে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে ৬ মাস বয়স থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের। এ ক্ষেত্রে ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় দেশে নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে শিশুর ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ১৫ মাস বয়সে। কিন্তু হাম–রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার আগে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় টিকা দেওয়া হবে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী দেশের সব শিশুকে। ইপিআইয়ের হিসাবে দেশে এই বয়সী শিশু আছে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন। গত শুক্রবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লক্ষ্যমাত্রা হিসাবে শিশুদের এই সংখ্যাই ব্যবহার করে এসেছে।
তবে ২৮ জুন দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার পর একই বয়সী শিশুদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি বড় আকার ধারণ করে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে ৬ মাস বয়স থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের। এ ক্ষেত্রে ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।
ভিটামিন এ এবং হাম–রুবেলার ক্ষেত্রে একই বয়সী শিশুদের সংখ্যায় পার্থক্য ৪৬ লাখ। এ ব্যাপারে ইপিআইয়ের উপপরিচালক হাসানুল মাহমুদ ৭ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, ৫ এপ্রিল টিকাদানের শুরুতে ৩০টি উপজেলায় শিশুর সংখ্যা ছিল অনুমিত। বাকি শিশুর সংখ্যা নির্ধারিত হয় ‘মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের’ ওপর ভিত্তি করে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সংখ্যার মিল আছে। তারপরও সংখ্যার পার্থক্যের বিষয়টি আমরা অনুসন্ধান করে দেখছি।’
বাগেরহাটের একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেছেন, হাম–রুবেলার টিকা দেওয়ার আগে তাড়াহুড়া করে মাইক্রোপ্ল্যানিং করা হয়েছিল। তাতে কিছু শিশু বাদ পড়া অস্বাভাবিক নয়।
ইপিআই সহায়িকা অনুযায়ী মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ে দেশের প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নাম, আয়তন, জনসংখ্যার উপাত্ত, কতবার টিকাদান, আগের বছরের তথ্য, মাঠকর্মীর বিবরণ থাকে। ওয়ার্ডভিত্তিক প্রতিটি টিকাকেন্দ্রের আওতাধীন এলাকায় মোট জনসংখ্যা এবং কত শিশু টিকা পাওয়ার যোগ্য, তা সরেজমিনে সংগ্রহ করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
বাগেরহাটের একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেছেন, হাম–রুবেলার টিকা দেওয়ার আগে তাড়াহুড়া করে মাইক্রোপ্ল্যানিং করা হয়েছিল। তাতে কিছু শিশু বাদ পড়া অস্বাভাবিক নয়।
টিকা কর্মসূচি এবং ভিটামিন এ কর্মসূচি দুটোই পরিচালিত হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুটি পৃথক দপ্তরের অধীন। রাজধানীর মহাখালীতে একটি দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরের দূরত্ব ২০০ গজের কম। কিন্তু শিশুর সংখ্যায় এত বড় পার্থক্য কেন?
ভিটামিন এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির আওতায়। এই কর্মসূচির পরিচালক মো. ইউনূস আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন বয়সী শিশুদের সঠিক ও হালনাগাদ সংখ্যা থাকে প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। আমরা ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন শুরুর আগে সব জেলার সিভিল সার্জনদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছি। আমরা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি সিভিল সার্জনদের পাঠানো সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে। তাতে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখই হয়।’
মো. ইউনূস আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে ২ কোটি ২৩ লাখ। এর অর্থ ওই বয়সী ২ কোটি ২৩ লাখ শিশু আছেই।
ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের তথ্য ঠিক হলে দেশে ওই বয়সী শিশু ২ কোটি ২৬ লাখ। এদের মধ্যে হামের টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ, অর্থাৎ ৪২ লাখ বা ১৮ শতাংশ শিশু এখনো টিকা পায়নি। এরা হামের ঝুঁকিতে আছে।
এদিকে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিকার কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। আগের দিন অর্থাৎ ১০ জুলাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১০৩ শতাংশ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ যত শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা তার চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪টি শিশু। টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫৯টি শিশু।
২০ মে হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার আগেই সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছিল, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশু টিকা পাচ্ছে। তখন ইপিআইয়ের উপপরিচালক হাসানুল মাহমুদসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেছিলেন, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী কিছু শিশু টিকা নিতে আসায় তাদের ফেরত দেওয়া হয়নি বলে হার বেশি হয়েছে। তাঁদের এসব বক্তব্য প্রথম আলোতে ছাপাও হয়েছে।
ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের তথ্য ঠিক হলে দেশে ওই বয়সী শিশু ২ কোটি ২৬ লাখ। এদের মধ্যে হামের টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ, অর্থাৎ ৪২ লাখ বা ১৮ শতাংশ শিশু এখনো টিকা পায়নি। এরা হামের ঝুঁকিতে আছে।
এখনো যে হাম পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তার অন্যতম কারণ সব শিশু টিকা পায়নি। ৪৬ লাখ সংখ্যাটি অনেক বড়। আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটনা। সংখ্যার এই বিপুল পার্থক্য এটাই নির্দেশ করে, হামের এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা তা যথাযথভাবে পালন করেননি। পুরো ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত।জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ
জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞরা বলেন, হামের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক ছিল না। ইপিআইয়ের সাবেক উপপরিচালক তাজুল এ বারি প্রথম আলোকে বলেন, ২০১০ সালে হাম–রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইনের সময় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ। এখনকার মতো লক্ষ্যমাত্রা। তখন বয়স সীমা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর। এখন বয়স সীমা ৬ মাস থেকে ৫ বছর। শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ারই কথা।
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এখনো যে হাম পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তার অন্যতম কারণ সব শিশু টিকা পায়নি। ৪৬ লাখ সংখ্যাটি অনেক বড়। আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটনা। সংখ্যার এই বিপুল পার্থক্য এটাই নির্দেশ করে, হামের এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা তা যথাযথভাবে পালন করেননি। পুরো ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত।